মাগুরা জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস। এটি যেন শিক্ষা অফিস নয়, অবৈধ আয়ের এক রমরমা বাণিজ্যিক কেন্দ্র। এই অফিসে ঘুষ ছাড়া নড়ে না কোনো ফাইল। এমপিওভুক্তি, উচ্চতর স্কেল, এরিয়া বিল, অডিট জবাব, এডহক কমিটির অনুমোদন—প্রতিটি কাজেই রয়েছে আলাদা ঘুষের রেট। আর এই নির্ধারিত রেটের টাকা না দিলে মাসের পর মাস ফাইল পড়ে থাকছে কম্পিউটার অপারেটর নজরুল ইসলামের টেবিলের নিচে।
অফিসে প্রধান ক্যাশিয়ার মো. সেলিম রেজা নির্ধারিত ঘুষের টাকা হাতে পাওয়ার পর শুরু হয় সেবা প্রদানের পরবর্তী প্রক্রিয়া। আর ঘুষ বাণিজ্যের এই পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে জেলা শিক্ষা অফিসের প্রধান কর্তা প্রদ্যুৎ কুমার দাসের বিরুদ্ধে। মূলত তার নির্দেশনায়ই চলে এই বাণিজ্য। তার সহযোগী হিসেবে রয়েছেন সেলিম ও নজরুল।
ভুক্তভোগী শিক্ষকদের অভিযোগ, ঘুষের টাকা ছাড়া তারা কেউ কথা বলতেও রাজি হন না। শিক্ষা অফিসের ঘুষ বাণিজ্যের বিষয়টি পুরো জেলার শিক্ষকরাই অবগত। তাই কোনো প্রয়োজনে শিক্ষকরা শিক্ষা অফিসে গেলে আগে থেকে ঘুষের টাকা নিয়ে যান। তবে রেটের চেয়ে কম নিয়ে গেলে জেলার বিদ্যালয়গুলোতে গিয়ে টাকা সংগ্রহ করেন সেলিম ও নজরুল। আবার টাকা প্রদানের পরও কাঙ্খিত সেবার না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে এই তিনজনের বিরুদ্ধে।
জেলা সদর উপজেলার বড়শোলই পঞ্চপল্লী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের এমপিওভুক্তির ফাইল খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ে (ডিডি) পাঠানোর জন্য ৫০ হাজার টাকা নেন প্রদ্যুৎ কুমার। কিন্তু টাকা দেওয়ার পরও সেই ফাইল ফেরত আসে। বলা হয় এটি ত্রুটিযুক্ত।
এমপিওভুক্ত নয়, উচ্চতর স্কেলের ফাইল পাঠাতেও শিক্ষকদের কাছ থেকে ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। শ্রীপুর উপজেলার লাঙ্গলবাঁধ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক উচ্চতর গ্রেডের ফাইল পাঠাতে ১০ হাজার টাকা দিয়েছেন বলে দাবি করেছেন। একই দাবি করেছেন ইচ্ছাখাদা গঙ্গারামপুর আলেয়া মাদ্রাসা ও হার্ট দারিয়াপুর সম্মেলন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক।
সম্প্রতি এক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আরও বিস্ফোরক অভিযোগ। নাকোল রাইচরণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একটি প্রতিবেদনের মন্তব্য পরিবর্তন করে অনুকূলে আনতে শিক্ষা অফিসের প্রদ্যুৎ কুমারের কক্ষে প্রায় তিন লাখ টাকা ঘুষ লেনদেন হয়েছে। এসময় সেলিম রেজা, নজরুল ইসলামসহ আরও কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন।
এত হেনস্তার পরও চাকরি হারানো ও প্রশাসনিক হয়রানির ভয়ে কোনো শিক্ষক প্রকাশ্যে মুখ খুলতে রাজি নন। তাদের দাবি, শিক্ষা অফিসকে দ্রুত দুর্নীতিমুক্ত করা হোক।
এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নিতে মাগুরা জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসে যান নাগরিক প্রতিদিনের সংবাদদাতা এস এম শিমুল রানা। এসময় অভিযুক্ত নজরুল ইসলাম এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি। বরং তিনি সাংবাদিকের ওপর চড়াও হন এবং ক্যামেরা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালান। এছাড়াও বিভিন্ন ভয়ভীতি দেখান এবং হুমকি দেন।
অপরদিকে এ বিষয়ে কথা বলতে চাইলেও প্রধান ক্যাশিয়ার অভিযুক্ত সেলিম রেজা ও প্রধান কর্মকর্তা প্রদ্যুৎ কুমার দাসকে অফিসে পাওয়া যায়নি। সেলিম রেজাকে ফোন করা হলে তিনি অভিযোগের বিষয়টি মিথ্যা বলে দাবি করেন। একই দাবি করেন প্রদ্যুৎ কুমারও। তিনি বলেন, ‘এরকম কোনো ঘটনা আমার জানা নেই।’