ভারতে অবস্থানরত ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ফেরত চায় বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বাংলাদেশ সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে বৃহস্পতিবার (২১ মে) দুপুরে সমসাময়িক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা জানান।
‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে শোনা যাচ্ছে, শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আসবেন, তার ফিরে আসার জন্য মিছিল হচ্ছে। আপনারা পর্যবেক্ষণ করছেন কি না?’—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘ফিরে আসার কার্যক্রম কী? আমরাও তো তাকে ফেরত চাই, সেটা আইনিভাবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা তো তাকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই দেশে ফেরত চাই। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এবং বিদ্যমান এক্সট্রাডিশন চুক্তি অনুযায়ী তাকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিক অনুরোধ করা হয়েছে, যেন তিনি বাংলাদেশে মামলার মুখোমুখি হন।’
রাজধানীর মিরপুরে চাঞ্চল্যকর রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার প্রধান আসামি সোহেল ও তার সহযোগী স্ত্রীকে ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে জানিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘মূল আসামি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। সম্ভাব্য সংক্ষিপ্ততম সময়ের মধ্যে মামলার তদন্ত শেষ করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হবে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশে সংঘটিত প্রতিটি জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রে পুলিশ সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের সঙ্গে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রতিটি ঘটনায় জড়িত আসামিদের দ্রুততম সময়ে আইনের আওতায় আনা হয়েছে এবং এর কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি।’
তিনি আরও বলেন, অপরাধ দমনে পুলিশ ‘প্রো-অ্যাক্টিভ’ ও ‘রি-অ্যাক্টিভ’—উভয় পদ্ধতিতে কাজ করছে। মাদক, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানগুলো মূলত ‘প্রো-অ্যাক্টিভ’ বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, যাতে অপরাধ সংঘটিত না হয়। অন্যদিকে ধর্ষণ বা হত্যার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত অপরাধের ক্ষেত্রে ‘রি-অ্যাক্টিভ’ ব্যবস্থা হিসেবে দ্রুত আসামি গ্রেপ্তার এবং তদন্ত সম্পন্ন করা হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা বেশ কয়েকটি চাঞ্চল্যকর মামলার তদন্তেও নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কুমিল্লার তনু হত্যা মামলা অন্যতম। এ মামলায় একজন আসামিকে গ্রেপ্তার করে ডিএনএ ম্যাচিং প্রক্রিয়া চলছে এবং আরও একজনকে শনাক্ত করা হয়েছে।
এ ছাড়া কুমিল্লায় সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, বগুড়ায় তরুণী ধর্ষণ, কাপাসিয়ায় পাঁচ খুন ও ঢাকার মান্ডায় প্রবাসী হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িতদেরও গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের বিশেষ চিরুনি অভিযান ও ব্লক রেইডের কথাও তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, মে মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে রাজধানীর মোহাম্মদপুর, শেরে বাংলা নগর ও আদাবর এলাকায় অভিযান চলছে। গত ১৮ ও ১৯ মে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী ও তেজগাঁও এলাকায় অভিযান চালিয়ে যথাক্রমে ৪১ জন ও ৬৩ জন ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ও ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আইন সংস্কার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আইন সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং সময়ের চাহিদা অনুযায়ী আইন যুগোপযোগী করা হবে। তবে আবেগতাড়িত হয়ে চটজলদি আইন প্রণয়ন বা বিশেষ আদালত গঠন সমীচীন নয়। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে গিয়ে যেন কোনো ‘অবিচার’ না হয় বা কঠোর আইনের অপব্যবহার না হয়, সেদিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে।
নতুন আদালত বা ট্রাইব্যুনাল সৃষ্টির চেয়ে বিদ্যমান নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতের সংখ্যা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করা আর্থিক ও প্রশাসনিকভাবে বেশি যৌক্তিক বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ‘সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট’ (সিএএ) কার্যকর ও পুশ-ইন প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এটি সম্পূর্ণভাবে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। ভারতের সিএএ বা আসামের এনআরসি তাদের নাগরিকদের জন্য নিজস্ব আইনকানুন। সেখানে আমাদের কোনো বক্তব্য থাকার অবকাশ নেই। তবে বাংলাদেশের সীমান্তে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে যেন কোনো প্রকার অনুপ্রবেশ না ঘটে।’