রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধে লিখেছিলেন—'মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ।’
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের সম্পর্ক কেবল দুই ভূখণ্ডের সম্পর্ক নয়; এটি একই ভাষা, একই সংস্কৃতি, একই ইতিহাস ও আবেগের সম্পর্ক। রাজনৈতিক সীমারেখা দুই বাংলাকে আলাদা করেছে ঠিকই, কিন্তু সাহিত্য, সংগীত, খাদ্যসংস্কৃতি, চিকিৎসা, পারিবারিক সম্পর্ক এবং সামাজিক বন্ধন আজও মানুষকে এক অদৃশ্য সুতোয় বেঁধে রেখেছে। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, লালন কিংবা জীবনানন্দের বাংলা কখনো কাঁটাতারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নাগরিকত্ব, সীমান্ত নিরাপত্তা, সিএএ (সিটিজেন এমেন্ডম্যান্ট অ্যাক্ট) এবং ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ ইস্যুকে কেন্দ্র করে নতুন ধরনের উত্তেজনা তৈরি হচ্ছে, যা দুই বাংলার দীর্ঘদিনের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
বিশেষ করে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে। বিজেপির জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে সীমান্ত ও পরিচয় প্রশ্নকে যুক্ত করে যে রাজনৈতিক ভাষ্য সামনে আনা হচ্ছে, তা শুধু নির্বাচনী কৌশল নয়; বরং সামাজিক মনস্তত্ত্বেও প্রভাব ফেলছে। প্রশ্ন হচ্ছে—এই রাজনীতি কি কেবল ভোটের জন্য, নাকি ভবিষ্যতে দুই বাংলার সাংস্কৃতিক ও মানবিক সম্পর্কেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে?
বিশ্ব রাজনীতির দিকে তাকালেই বোঝা যায়, অভিবাসন ও নাগরিকত্ব এখন সবচেয়ে স্পর্শকাতর রাজনৈতিক অস্ত্রগুলোর একটি। যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প মেক্সিকো সীমান্ত ইস্যুকে কেন্দ্র করে জাতীয়তাবাদী আবেগ তৈরি করেছিলেন। ইউরোপে শরণার্থী সংকটকে কেন্দ্র করে ডানপন্থী রাজনীতি শক্তিশালী হয়েছে। ভারতেও সেই একই প্রবণতা এখন সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে আরও দৃশ্যমান। পশ্চিমবঙ্গে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ’ প্রশ্নকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক আবেগ তৈরি করা হচ্ছে, তা কেবল ভোটের সমীকরণ নয়; বরং পরিচয় ও সংস্কৃতির রাজনীতিকেও নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে।
তবে এই পুরো বিতর্কের সবচেয়ে সংবেদনশীল দিক হলো ধর্মীয় সহাবস্থান। বাংলা অঞ্চলের সবচেয়ে বড় ঐতিহ্য ছিল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই অঞ্চলে হিন্দু-মুসলিমসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ একসঙ্গে বসবাস করেছে। গ্রামবাংলার মেলা, বাউল গান, পীর-আউলিয়ার দরগাহ, দুর্গাপূজা কিংবা পহেলা বৈশাখ—সবকিছুতেই ছিল এক ধরনের যৌথ সাংস্কৃতিক চেতনা। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের সামাজিক সম্পর্কের ভিত্তিও এই সহাবস্থান। কিন্তু যখন রাজনৈতিক বক্তব্যে ধর্মীয় পরিচয়কে বারবার সামনে আনা হয়, তখন সমাজে অদৃশ্য বিভাজন তৈরি হতে শুরু করে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধও ছিল অসাম্প্রদায়িক চেতনার লড়াই। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গ বহু বছর ধরে নিজেকে ধর্মীয় সহনশীলতা ও উদার সংস্কৃতির ভূখণ্ড হিসেবে পরিচিত করেছে। ফলে সীমান্ত রাজনীতির নামে যদি ধর্মীয় মেরুকরণ বাড়তে থাকে, তাহলে সেটি কেবল রাজনৈতিক উত্তেজনা নয়; বরং দুই বাংলার ঐতিহাসিক সংস্কৃতিকেও আঘাত করবে। কারণ বাংলা সংস্কৃতির শক্তি কখনো বিভাজনে ছিল না; বরং সহাবস্থান ও মানবিকতায় ছিল।
বাস্তবতা হলো, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের সম্পর্ককে কেবল ‘অনুপ্রবেশ’ শব্দ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। প্রতিবছর লাখো বাংলাদেশি বৈধভাবে ভারতে যান চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা ও পর্যটনের জন্য। কলকাতার বহু হাসপাতালের আয়ের বড় অংশ আসে বাংলাদেশি রোগীদের কাছ থেকে। আবার বাংলাদেশ বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির একটি। ফলে দুই দেশের সম্পর্ক কেবল আবেগের নয়; অর্থনীতি, চিকিৎসা, শিক্ষা ও আঞ্চলিক সহযোগিতার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি নিজেই বহুমাত্রিক। এই বাংলার রাজনীতি একসময় বামপন্থী উদারতা, সাহিত্যচর্চা, নাট্য আন্দোলন এবং বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডলের জন্য পরিচিত ছিল। কিন্তু গত এক দশকে সেই রাজনৈতিক ভাষা বদলেছে। এখন সেখানে ধর্মীয় মেরুকরণ, জাতীয়তাবাদ এবং সীমান্ত রাজনীতি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। এর প্রভাব শুধু নির্বাচনে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি সামাজিক সম্পর্কেও ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ ধীরে ধীরে একে অপরকে সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করে।
বাংলাদেশ থেকেও বিষয়টি আবেগের জায়গা থেকে দেখা হয়। কারণ পশ্চিমবঙ্গ বহু বাংলাদেশির কাছে শুধুই ভারতের একটি রাজ্য নয়; এটি ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক আত্মীয়তার প্রতীক। কলকাতার বইমেলা, রবীন্দ্রসংগীত, চলচ্চিত্র, চিকিৎসা ব্যবস্থা কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের সম্পর্ক বহু পুরোনো। ফলে যখন রাজনৈতিক বক্তব্যে বারবার “বাংলাদেশি” শব্দটি নেতিবাচকভাবে ব্যবহার করা হয়, তখন তা কেবল রাজনৈতিক বার্তা নয়; বরং সামাজিক মনস্তত্ত্বেও প্রভাব ফেলে।
এখানে বাংলাদেশেরও দায়িত্ব রয়েছে। সীমান্ত অপরাধ, অবৈধ মানবপাচার, জাল কাগজপত্র ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। কারণ বাস্তব সমস্যাকে অস্বীকার করলে রাজনৈতিক উগ্রতা আরও শক্তিশালী হয়। একইভাবে ভারতকেও বুঝতে হবে—বাংলাদেশ এখন আর ১৯৭১–পরবর্তী দুর্বল অর্থনীতির দেশ নয়; বরং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, বাণিজ্য ও সংযোগের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। ফলে দুই দেশের সম্পর্ককে রাজনৈতিক বক্তৃতার তাৎক্ষণিক লাভের বাইরে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।
রাজনীতির সবচেয়ে বড় সংকট তখনই তৈরি হয়, যখন তা মানুষের ভয়কে পুঁজি করে। ইতিহাস বলছে, ভয় ও বিভাজনের রাজনীতি সাময়িকভাবে জনপ্রিয়তা পেলেও দীর্ঘমেয়াদে সমাজকে অস্থির করে তোলে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ, উপমহাদেশের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা কিংবা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের ধর্মীয় সংঘাত প্রমাণ করে—যখন রাজনীতি মানুষের পরিচয়কে অস্ত্রে পরিণত করে, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষই।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই বিভাজনকে আরও দ্রুত ছড়িয়ে দিচ্ছে। একটি রাজনৈতিক বক্তব্য মুহূর্তেই দুই দেশের লাখো মানুষের আবেগকে উত্তপ্ত করে তুলছে। ফলে দায়িত্বশীল রাজনৈতিক ভাষা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি। বিরোধী রাজনীতি গণতন্ত্রের অংশ, সীমান্ত নিরাপত্তাও রাষ্ট্রের অধিকার; কিন্তু রাজনৈতিক বক্তব্য এমন হওয়া উচিত নয়, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে ঘৃণা, আতঙ্ক বা বিদ্বেষ বাড়িয়ে তোলে।
দুই বাংলার সম্পর্কের শক্তি কখনো রাজনীতিতে ছিল না; ছিল সংস্কৃতিতে, সাহিত্যে, মানবিকতায় এবং ধর্মীয় সহাবস্থানে। সীমান্তের কাঁটাতার ভাষাকে আলাদা করতে পারেনি, সংগীতকে থামাতে পারেনি, সংস্কৃতির প্রবাহও আটকাতে পারেনি। তাই আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—আমরা কি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সহাবস্থানের বাংলা রেখে যেতে চাই, নাকি বিভাজনের বাংলা?
রাজনীতি পরিবর্তনশীল। ক্ষমতা আসে, যায়। কিন্তু সংস্কৃতি, ইতিহাস ও মানুষের সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী। তাই দুই বাংলার ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে কে কত জোরে রাজনৈতিক স্লোগান দিল তার ওপর নয়; বরং কে কত দায়িত্বশীলভাবে সম্পর্ক, সহনশীলতা ও মানবিকতাকে রক্ষা করতে পারল তার ওপর।
হয়ত এই ভাবনা থেকেই কবি গুরু তার নৈবেদ্য কবিতায় লিখেছিলেন ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’। পরিশেষে বলতে চাই ‘ভাষার যে বন্ধন রক্তে লেখা, তাকে কোনো সীমান্ত কখনো থামাতে পারে না।’
লেখক: উন্নয়ন কর্মী ও নীতি বিশ্লেষক