চীনের দেওয়া উপহার, ব্যাজ ও বিশেষ মোবাইল ফোন বেইজিং বিমানবন্দরের রানওয়ের পাশেই ফেলে দিয়ে দেশে ফিরেছেন মার্কিন কর্মকর্তারা—এমন এক ঘটনা ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ছবিটি প্রথমে অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হলেও পরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এ নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
ঘটনাটি শুধু একটি কূটনৈতিক সফরের শেষ মুহূর্ত নয়; বরং এটি বর্তমান যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের গভীর অবিশ্বাস, সাইবার গুপ্তচরবৃত্তির আশঙ্কা এবং বৈশ্বিক শক্তির স্নায়ুযুদ্ধের নতুন বাস্তবতাকেও সামনে এনে দিয়েছে।
সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সংক্ষিপ্ত এক রাষ্ট্রীয় সফরে চীন যান। বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার বৈঠক আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক গুরুত্ব পায়। বাণিজ্যযুদ্ধ, তাইওয়ান ইস্যু, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইরান সংকট এবং সামরিক উত্তেজনার মতো বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দুই নেতার আলোচনা হয়। সফরজুড়ে চীন ট্রাম্পকে জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনা দেয়। লাল গালিচা, সামরিক গার্ড অব অনার, শিশুদের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, সব মিলিয়ে পুরো আয়োজন ছিল অত্যন্ত কৌশলগত ও প্রতীকী।
কিন্তু সফরের শেষ মুহূর্তে ঘটে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ঘটনা।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, এয়ার ফোর্স ওয়ানে ওঠার আগে মার্কিন কর্মকর্তারা এবং সফরসঙ্গী সাংবাদিকরা চীনের পক্ষ থেকে দেওয়া বিভিন্ন সামগ্রী বিমানবন্দরের পাশে রাখা একটি বিনে ফেলে দেন। এর মধ্যে ছিল চীনা কর্তৃপক্ষের দেওয়া অস্থায়ী মোবাইল ফোন, পরিচয়পত্র, ব্যাজ, ল্যাপেল পিনসহ নানা উপহারসামগ্রী।
নিউইয়র্ক পোস্টের হোয়াইট হাউস প্রতিনিধি এমিলি গুডিন সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, ‘চীন থেকে কিছুই বিমানে নেওয়া যাবে না।’ তার সেই বক্তব্য পরে একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম উদ্ধৃত করে।
প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম টেকক্রাঞ্চ জানায়, এই পদক্ষেপ মূলত নিরাপত্তা ও গুপ্তচরবৃত্তির আশঙ্কা থেকে নেওয়া হয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের ধারণা, বিদেশি রাষ্ট্র বিশেষ করে চীনের দেওয়া ইলেকট্রনিক ডিভাইস বা অন্যান্য সামগ্রীতে নজরদারি প্রযুক্তি বা ট্র্যাকিং ব্যবস্থা থাকতে পারে। সে কারণে সফরে ব্যবহৃত তথাকথিত ‘বার্নার ফোন’ বা অস্থায়ী ফোনও ধ্বংস বা ফেলে দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ঘটনাটি প্রতীকী হলেও এর কূটনৈতিক গুরুত্ব অত্যন্ত বড়। কারণ এটি দেখিয়ে দেয়, ক্যামেরার সামনে হাসিমুখে করমর্দন হলেও ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে অবিশ্বাস কতটা গভীর। একদিকে ট্রাম্প ও শি জিনপিং বৈঠকে সম্পর্ক উন্নয়নের কথা বলেছেন, অন্যদিকে মার্কিন কর্মকর্তারা চীনের দেওয়া একটি ব্যাজ পর্যন্ত সঙ্গে নিতে রাজি হননি। ফলে পুরো বিষয়টি অনেকের কাছে ‘আধুনিক স্নায়ুযুদ্ধের বাস্তব ছবি’ হিসেবে ধরা দিয়েছে।
এদিকে কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, এটি ছিল মার্কিন নিরাপত্তা প্রটোকলের অংশ এবং উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক সফরে এমন সতর্কতা অস্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাইবার গুপ্তচরবৃত্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক বারবার উত্তপ্ত হয়েছে। ওয়াশিংটন বহুবার অভিযোগ করেছে, চীন মার্কিন সরকারি প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি কোম্পানি ও অবকাঠামোতে সাইবার হামলা চালিয়েছে। চীন অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে।
ঘটনার আরেকটি দিকও গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সফরে ট্রাম্প আগের তুলনায় অনেক বেশি সংযত ও নমনীয় ছিলেন। বেইজিংয়ে তাকে অত্যন্ত সম্মানজনক অভ্যর্থনা দেওয়া হলেও, সফরের শেষের এই উপহার ফেলে দেওয়ার ঘটনা যেন মনে করিয়ে দিল কূটনৈতিক সৌজন্যের আড়ালে বাস্তব প্রতিযোগিতা এখনও তীব্র।
অনেকে সামাজিক মাধ্যমে প্রশ্ন তুলেছেন, এটি কি চীনের প্রতি অপমান ছিল? নাকি শুধুই নিরাপত্তাজনিত সতর্কতা? এ নিয়ে বিভক্ত মত দেখা গেছে। কেউ এটিকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা বলছেন, আবার কেউ বলছেন, এটি দুই দেশের সম্পর্কের গভীর সংকটের প্রতীক।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার বিশ্বের দুই বৃহৎ শক্তির সম্পর্ক এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে একটি ব্যাজ, একটি ফোন কিংবা একটি ছোট উপহারও কেবল উপহার হিসেবে দেখা হচ্ছে না; বরং সম্ভাব্য কৌশলগত ঝুঁকি হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। আর সেই বাস্তবতাই বেইজিং বিমানবন্দরের সেই ডাস্টবিনের ছবিকে বিশ্বরাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকে পরিণত করেছে।
সূত্র: রয়টার্স ও টেকক্রাঞ্চ