পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর রাতভর স্থল অভিযান ও বিমান হামলায় আফগানিস্তানে অন্তত ৩৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে তালেবান সরকার। এ ছাড়া ১৬০ জনের বেশি আহত হয়েছেন বলেও দাবি করা হয়। সোমবার (২৯ জুন) আফগান কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) এ খবর জানিয়েছে।
এদিকে এ ঘটনার প্রতিশোধ নেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে তালেবান সরকার। দেশটির তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের প্রকাশনাবিষয়ক উপমন্ত্রী হায়াতুল্লাহ মোহাজের ফারাহি বলেন, ‘গভীর রাতে সামরিক জান্তা কাপুরুষের মতো পাকতিকা ও কুনার প্রদেশে বোমা হামলা চালিয়েছে। যথাসময়ে এর জবাব দেওয়া হবে।’
অন্যদিকে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারারের ভাষ্য, রোববার গভীর রাতে পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তে স্থল অভিযান চালানো হয়েছে। পরে আফগান ভূখণ্ডে জঙ্গিদের আস্তানা ও নিরাপদ ঘাঁটি লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালানো হয়। এসব অভিযানে ২৯ জঙ্গি নিহত হয়েছে। পাকিস্তানের ভাষ্য, দেশজুড়ে সাম্প্রতিক একাধিক জঙ্গি হামলার জবাব হিসেবেই এই অভিযান চালানো হয়।
তালেবান সরকারের উপমুখপাত্র হামদুল্লাহ ফিতরাতের দাবি, পাকতিয়া প্রদেশের চামকানি জেলায় পাকিস্তানি বাহিনীর হামলায় একটি বাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে। এতে এক বৃদ্ধ ও এক শিশু নিহত এবং পরিবারের আরও কয়েকজন আহত হন। পরে স্থানীয় বাসিন্দারা উদ্ধারকাজে এগিয়ে গেলে একই স্থানে দ্বিতীয় দফায় হামলা চালানো হয়। এতে আরও ২৮ গ্রামবাসী নিহত এবং ১৫৮ জন আহত হন।
তিনি আরও দাবি করেন, পাকতিকা প্রদেশের গিয়ান জেলায় আরেকটি বাড়িতে হামলায় ছয়জন নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। কুনার প্রদেশেও একটি বেসামরিক বাড়িতে হামলা চালানো হয়। সেখানে কোনো হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও প্রায় ৩০টি গবাদিপশু মারা যায়।
অন্যদিকে, পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনটি ভিডিও প্রকাশ করেন। তিনি দাবি করেন, এসব ভিডিওতে পাকতিয়া ও কুনার প্রদেশে জামাত-উল-আহরার এবং ফিতনা আল-খাওয়ারিজ-এর ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দৃশ্য দেখা গেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব হামলায় সন্ত্রাসীরা নিহত হয়েছে এবং বিপুল অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত ধ্বংস করা হয়েছে।
তারার বলেন, ‘বিদেশি মদদপুষ্ট সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে পাকিস্তানের সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকবে।’
এপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তান সরকার ভারত-সমর্থিত পাকিস্তানি তালেবান ও অন্যান্য জঙ্গিগোষ্ঠীকে বোঝাতে ‘খাওয়ারিজ’ শব্দটি ব্যবহার করে। জামাত-উল-আহরার হচ্ছে পাকিস্তানি তালেবানের একটি বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠী।
তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল পাকিস্তানের অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানের উচিত নিজের দেশের সন্ত্রাসী অবকাঠামোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া।’
এপির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানের পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে জঙ্গি হামলা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পাকিস্তান সরকার এসব হামলার জন্য মূলত তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) এবং তাদের মিত্র জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করে। টিটিপি তালেবান থেকে আলাদা সংগঠন হলেও উভয়ের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
সীমান্তপারের এই অভিযানটি আসে করাচিতে পাকিস্তান রেঞ্জার্সের আঞ্চলিক সদরদপ্তরে জঙ্গি হামলার পর। ওই হামলায় তিন সেনাসদস্য নিহত হন। পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনী তিন হামলাকারীকে হত্যা এবং আহত অবস্থায় একজনকে আটক করে, যাকে আফগান নাগরিক বলে দাবি করেছে সেনাবাহিনী। এ হামলার দায় স্বীকার করেছে জামাত-উল-আহরার।
এরও তিন সপ্তাহ আগে পাকিস্তান আফগানিস্তানে কথিত জঙ্গি ঘাঁটি লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়েছিল। যদিও আন্তর্জাতিক মহলের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছিল, তবু সীমান্তে সংঘাত আবারও নতুন করে তীব্র হয়ে উঠেছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি সামরিক অভিযানে শত শত মানুষ নিহত হয়েছেন। পাকিস্তানের বিমান হামলার জবাবে আফগানিস্তানও সীমান্তের ওপারে পাল্টা হামলা চালিয়েছিল।
বহু দফা আলোচনা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত কোনো স্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়নি। গত এপ্রিলে চীনের মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠিত বৈঠকেও উত্তেজনা না বাড়ানো এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ খোঁজার বিষয়ে দুই দেশ সম্মত হয়েছিল।
তবে সর্বশেষ অভিযানের পরও পাকিস্তানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সীমান্ত পরিস্থিতি আপাতত শান্ত থাকলেও নিরাপত্তা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।