বিশ্ব রাজনীতির অস্থির সময়ের মধ্যেই সম্পর্ককে নতুন পর্যায়ে নেওয়ার ঘোষণা দিল চীন ও রাশিয়া। বেইজিংয়ে দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে এসে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেছেন।
বৈঠকের পর দুই নেতা জানিয়েছেন, তারা শুধু অর্থনীতি বা বাণিজ্য নয়, বরং বিশ্ব রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়েও একসঙ্গে কাজ করতে চান। তাদের ভাষায়, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা আরও ন্যায্য ও ভারসাম্যপূর্ণ হওয়া দরকার।
চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের গণভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে শি চিনপিং বলেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এমন বাস্তবতায় চীন ও রাশিয়া সমান মর্যাদা, পারস্পরিক সম্মান এবং পারস্পরিক লাভের ভিত্তিতে সম্পর্ককে আরও গভীর করেছে।
তিনি বলেন, দুই দেশের রাজনৈতিক আস্থা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী। বাণিজ্য, জ্বালানি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, পরিবহন এবং জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগ, সব ক্ষেত্রেই সহযোগিতা বেড়েছে।
পুতিনও একই সুরে কথা বলেন। তিনি জানান, রাশিয়া-চীন সম্পর্ক এখন অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। তার মতে, বহু আন্তর্জাতিক চাপ ও সংকটের মধ্যেও দুই দেশের সম্পর্ক টিকে আছে এবং আরও শক্তিশালী হয়েছে। তিনি বলেন, এই সম্পর্ক এখন বিশ্বের জন্য একটি উদাহরণ।
এ বছর চীন-রাশিয়ার কৌশলগত অংশীদারত্বের ৩০ বছর এবং দুই দেশের বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা চুক্তির ২৫ বছর পূর্ণ হয়েছে। এই চুক্তির মেয়াদ আরও বাড়ানোর বিষয়ে দুই নেতা একমত হয়েছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, এর মাধ্যমে দুই দেশ দীর্ঘমেয়াদি জোটের বার্তাই দিয়েছে।
বৈঠকে শুধু কূটনীতি নয়, বাস্তব অর্থনৈতিক সহযোগিতাকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, টানা তৃতীয় বছরের মতো দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ ২০ হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। গত ১৬ বছর ধরে চীন রাশিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে ইউরোপীয় বাজার থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া রাশিয়া এখন চীনের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে।
শি চিনপিং বলেন, দুই দেশকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, পরিবহন এবং বিজ্ঞানভিত্তিক নতুন শিল্পে সহযোগিতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ গবেষণা এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর খাতেও একসঙ্গে কাজ করার ওপর জোর দেন তিনি।
একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। শিক্ষা, চলচ্চিত্র, পর্যটন ও খেলাধুলায় আদান-প্রদান বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এ উপলক্ষে চীন-রাশিয়া শিক্ষাবর্ষ কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। দুই নেতা যৌথভাবে এর উদ্বোধন করেন।
এই বৈঠকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল বিশ্ব রাজনীতি নিয়ে দুই দেশের অভিন্ন অবস্থান। শি চিনপিং বলেন, জাতিসংঘভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে এবং যুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থার মূল নীতিগুলো রক্ষা করতে হবে। তিনি উন্নয়নশীল দেশগুলোকে আরও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলের পরিস্থিতি নিয়েও দুই নেতা আলোচনা করেন। শি বলেন, সব ধরনের যুদ্ধ ও সংঘাত দ্রুত বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। কারণ এসব সংঘাত শুধু একটি অঞ্চল নয়, বরং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ, শিল্প উৎপাদন এবং বাণিজ্য ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
পুতিন বলেন, বর্তমান অস্থির বিশ্বে রাশিয়া-চীন সহযোগিতা একটি দৃঢ় শক্তি হিসেবে কাজ করছে। তিনি জানান, রাশিয়া আন্তর্জাতিক বিভিন্ন জোট ও আঞ্চলিক ব্যবস্থায় চীনের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে চায়। বিশেষ করে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা এবং উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জোটকে আরও শক্তিশালী করার কথাও বলেন তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সফর শুধু দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয় নয়; এটি আসলে বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন শক্তির ভারসাম্যের ইঙ্গিত। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন বাড়ার পর চীন ও রাশিয়া এখন নিজেদের আরও ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে উপস্থাপন করছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, বাণিজ্য সংঘাত, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার মধ্যেই এই জোটকে ভবিষ্যতের ভূরাজনীতিতে বড় প্রভাবক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক লি জিগুও বলেছেন, বর্তমান বিশ্বে যখন বিভক্তি ও জোটভিত্তিক সংঘাত বাড়ছে, তখন চীন ও রাশিয়ার সম্পর্ক বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠছে। তার মতে, দুই দেশের সম্পর্কের স্থায়িত্ব ও পূর্বানুমানযোগ্যতা বিশ্ব শান্তি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সূত্র: সিনহুয়া ডটনেট, রয়টার্স