করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর পাশাপাশি জনমতের প্রতি সম্মান জানিয়ে প্রস্তাবিত বাজেটের কয়েকটি বিতর্কিত বিধান প্রত্যাহারের জন্য অর্থমন্ত্রীকে আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাতীয় সংসদে সোমবার (২৯ জুন) বাজেট অধিবেশনের আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তার সংশোধনীর প্রস্তাব অর্থমন্ত্রী ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সামনে তুলে ধরেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নরমালি দাবিটা বিরোধীদল থেকে হয়ে থাকে। আমি আপাতত ফিজিক্যালি না হলেও মানসিকভাবে ওনাদের পাশে গিয়ে কথা বলতে চাই।’
তিনি আরও বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ করবর্ষে করমুক্ত আয়ের সীমা তিন লাখ ৭৫ হাজার, ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ করবর্ষে চার লাখ ও ২০৩০-৩১ করবর্ষে সাড়ে চার লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই সীমা যথাক্রমে চার লাখ, সাড়ে চার লাখ ও পাঁচ লাখ টাকা করার প্রস্তাব রাখেন সংসদ নেতা।
স্বপ্রণোদিত বিনিয়োগের তথ্য প্রদর্শনসংক্রান্ত বিধান নিয়ে জনমনে ‘প্রশ্ন ও উদ্বেগ’ তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, জমি প্রকৃত মূল্যে নিবন্ধন না হওয়ার কারণে করদাতাদের হয়রানি কমাতেই এ বিধান আনা হয়েছিল। তবে অনেকেই এটিকে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ হিসেবে দেখছেন। তাই প্রস্তাবিত এই বিধান প্রত্যাহার করার জন্য অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।
এ ছাড়া করের আওতা বাড়াতে ব্যাংক হিসাব খোলা, বণ্টননামা দলিল নিবন্ধন ও সম্পত্তি নামজারির ক্ষেত্রে টিআইএন সনদ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবেও জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হচ্ছে বলে এ প্রস্তাবও প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান সরকারপ্রধান।
এ সময় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর বর্তমানে আরোপিত ১০ শতাংশ কর কমিয়ে পাঁচ শতাংশ করার প্রস্তাব দেন তারেক রহমান। তবে শর্ত হিসেবে তিনি বলেন, কর–সুবিধার বিনিময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে, ভাষা শিক্ষা ও ল্যাঙ্গুয়েজ ল্যাব স্থাপন করতে এবং দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বিনা বেতনে পড়াশোনার সুযোগ সম্প্রসারণ করতে হবে।
সেই সঙ্গে পার্বত্য ও সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য কর-সুবিধা আরও সম্প্রসারণের প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী। বর্তমানে পার্বত্য জেলায় পরিচালিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে অর্জিত আয়ের করমুক্ত সুবিধার পাশাপাশি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বেতনের আয়ও করমুক্ত করার সুপারিশ করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি মাননীয় অর্থমন্ত্রী ও পরিকল্পনামন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে অনুরোধ রাখতে চাই, পার্বত্য জেলার যে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী আছে, তাদের করমুক্ত আয়ের এই সুবিধাটা আরেকটু বাড়িয়ে তাদের ব্যবসা, কৃষি খাতসহ অন্যান্য আয়ের পাশাপাশি বেতনের আয়কেও করমুক্ত করা হোক। এটা পাহাড়ি ও সমতল—উভয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর যারা আছেন, উভয় ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।’
চিংড়িশিল্পের প্রসার ও রপ্তানি বাড়াতে প্রধানমন্ত্রী ফিড অ্যাডিটিভ, প্রোবায়োটিকস, ভিটামিন, মিনারেলস ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমদানির ওপর আরোপিত শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব করেন। এ ছাড়া স্থানীয় শিল্পের বিকাশে বিভিন্ন কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কমানোর সুপারিশ করেন। তিনি বলেন, ওষুধ ও শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত মধু আমদানির ওপর ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার করা উচিত। শিল্পে বহুল ব্যবহৃত কাঁচামাল পিভিসি ও পিইটি রেজিনের ওপর প্রস্তাবিত ১০ শতাংশ আমদানি শুল্ক কমিয়ে পাঁচ শতাংশ করার প্রস্তাবও দেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি অগ্নিনির্বাপক দরজা তৈরিতে ব্যবহৃত আমদানিকৃত কোল্ড-রোলড শিট, ফ্ল্যাট স্টিল পণ্যে ব্যবহৃত কোটেড ক্রোমিয়াম অক্সাইড ও বৈদ্যুতিক ক্যাবল উৎপাদনে ব্যবহৃত পরিশোধিত তামার তারের ওপর প্রস্তাবিত নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহারের আহ্বান জানান। এ ছাড়া আমদানিকৃত ফায়ার ব্রিকের ওপর প্রস্তাবিত ১৫ শতাংশ মূসক ও অগ্রিম কর বাতিলেরও প্রস্তাব করেন তিনি।
প্রক্রিয়াজাত শিল্পে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত আমদানিকৃত অপরিশোধিত কাজুবাদামের ওপর শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে পাঁচ শতাংশ করার অনুরোধ জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত এলইডি বাতি ও প্রিফ্যাব্রিকেটেড ভবনের জন্য আমদানিকৃত কাঁচামালের ওপর বিদ্যমান শুল্ক সুবিধার মেয়াদ ২০৩০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানোরও প্রস্তাব দেন।
উদ্যোক্তা উন্নয়নে সরকারের সহায়তার বিষয়টি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো স্টার্টআপ তহবিল উদ্যোগের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই তহবিল তরুণ উদ্যোক্তাদের সফল স্টার্টআপ গড়ে তুলতে সহায়তা করবে এবং দেশের যুবসমাজের জন্য উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে।
ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থা উৎসাহিত করতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, সার্চ ইঞ্জিন, অনলাইন মার্কেটপ্লেস ও অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যমে দেওয়া বিজ্ঞাপনের ওপর বিদ্যমান ১৫ শতাংশ মূসক কমিয়ে পাঁচ শতাংশ করার প্রস্তাব দেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, মূসকের হার কমানো হলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো অনানুষ্ঠানিকভাবে বিদেশে অর্থ পাঠানো থেকে বিরত থাকবে এবং কর পরিপালন বাড়ার মাধ্যমে সরকারের রাজস্বও বৃদ্ধি পাবে।
এ ছাড়া সোনা, প্লাটিনাম, হীরা ও রুপার গয়নার ওপর মূসকের হার পুনর্বিবেচনা, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সঙ্গে রাজস্ব ভাগাভাগি চুক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ১৫ শতাংশ মূসক পুরোপুরি অব্যাহতি এবং সরবরাহকারী পর্যায়ে সব ধরনের মাছ সরবরাহের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ মূসক অব্যাহতির প্রস্তাব করেন প্রধানমন্ত্রী।
দেশীয় মোটরযান শিল্পের বিকাশে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ডাবল কেবিন পিকআপ ও মাইক্রোবাসের ওপর মূসকের হার ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে পাঁচ শতাংশ করার প্রস্তাব দেন তিনি। এ ছাড়া ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কর পরিপালন সহজ করতে নির্বাচিত কিছু খাতে মূসক ব্যবস্থার আওতায় কো-এফিসিয়েন্ট দাখিলের বাধ্যবাধকতা শিথিল করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।