বিশ্ব রাজনীতি ও চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্পেনের বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা পেদ্রো আলমোদোভার। কান চলচ্চিত্র উৎসবে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে দানব বলে আখ্যায়িত করেছেন। তার এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
আলমোদোভার বলেন, বর্তমান বিশ্বে যে সহিংসতা, যুদ্ধ এবং মানবিক বিপর্যয় চলছে, তার পেছনে বড় শক্তিধর নেতাদের নীতিই দায়ী। তিনি বিশেষ করে গাজা উপত্যকায় চলমান যুদ্ধ, ইউক্রেন সংকট এবং বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা রাজনৈতিক বিভাজনের কথা উল্লেখ করেন। আলমোদোভারের ভাষায়, মানুষ মারা যাচ্ছে, শিশুরা ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ছে, অথচ বিশ্বনেতারা ক্ষমতার খেলায় মত্ত।
স্পেনের এই নির্মাতা বহু বছর ধরেই মানবাধিকার, স্বাধীনতা এবং যুদ্ধবিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত। এবারের কান উৎসবে নিজের নতুন চলচ্চিত্র নিয়ে হাজির হলেও সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ব রাজনীতিই বেশি গুরুত্ব পায়। তিনি বলেন, শিল্প ও চলচ্চিত্র কখনো বাস্তবতা থেকে আলাদা নয়। একজন শিল্পীর দায়িত্ব শুধু বিনোদন দেওয়া নয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলাও।
বিশেষ করে গাজা পরিস্থিতি নিয়ে আলমোদোভার অত্যন্ত আবেগপূর্ণ বক্তব্য দেন। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে গাজায় ইসরায়েলি হামলায় হাজারো মানুষের প্রাণহানি এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনায় বিশ্বের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের মতো তিনিও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোও বারবার সতর্ক করেছে যে, গাজার মানবিক পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নিয়েছে। খাদ্য, পানি ও চিকিৎসাসামগ্রীর সংকট সেখানে চরমে পৌঁছেছে।
একই সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়েও পুতিনের সমালোচনা করেন আলমোদোভার। তিনি বলেন, যুদ্ধের নামে সাধারণ মানুষকে বলি দেওয়া হচ্ছে। তার মতে, ক্ষমতার রাজনীতি এখন মানবিক মূল্যবোধকে গ্রাস করছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়েও কড়া ভাষায় কথা বলেন এই নির্মাতা। তিনি অভিযোগ করেন, বিশ্বজুড়ে বিভাজন, জাতীয়তাবাদী উগ্রতা এবং রাজনৈতিক বিদ্বেষকে আরও উসকে দিয়েছেন ট্রাম্পের মতো নেতারা। তার মতে, এসব নেতৃত্ব পৃথিবীকে আরও অনিরাপদ করে তুলছে, অস্থির করে তুলেছে।
আলমোদোভারের বক্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সাহসী অবস্থানকে সমর্থন করেছেন, আবার অনেকে এটিকে অতিরিক্ত রাজনৈতিক মন্তব্য বলেও সমালোচনা করেছেন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ইসরায়েলপন্থী কিছু মহল তার বক্তব্যের বিরোধিতা করেছে।
তবে এটি নতুন কিছু নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্ব চলচ্চিত্র অঙ্গনের অনেক তারকাই প্রকাশ্যে রাজনৈতিক অবস্থান নিচ্ছেন। কান চলচ্চিত্র উৎসব, বার্লিন উৎসব কিংবা ভেনিস উৎসব, এসব আন্তর্জাতিক মঞ্চ এখন শুধু সিনেমার প্রদর্শনী নয়, বরং বিশ্ব রাজনীতি ও মানবাধিকারের আলোচনা ক্ষেত্রেও পরিণত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আলমোদোভারের এই মন্তব্য আসলে বিশ্ব সংস্কৃতি অঙ্গনের এক বড় অংশের ক্ষোভের প্রতিফলন। গাজা যুদ্ধ, ইউক্রেন সংকট, বৈশ্বিক রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং মানবিক বিপর্যয়ের কারণে শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। আর সেই ক্ষোভই এবার কান উৎসবের মঞ্চে সরাসরি উচ্চারিত হলো।
সূত্র: এএফপি