পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা বনবিট এলাকায় চলছে সংরক্ষিত বনভূমি দখলের হিড়িক। সরকারি আরএস গেজেটভুক্ত হাজার হাজার বিঘা জমি এখন স্থানীয় প্রভাবশালী মহল, দালাল ও তদবিরকারীদের অভয়ারণ্য। প্রকাশ্যে গজারি বাগান কেটে ঘরবাড়ি ও বহুতল ভবন নির্মাণ করা হলেও বন বিভাগ যেন অন্ধকারের বাসিন্দা। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি- বন কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশের সাথে ভূমিদস্যুদের গভীর আঁতাত ও ঘুষ লেনদেনের কারণেই অস্তিত্ব সংকটে বনাঞ্চল।
সরেজমিন অনুসন্ধানে চন্দ্রা বনবিটের অধীনে একের পর এক অবৈধ স্থাপনা চোখে পড়েছে। দারুল উলুম মাদ্রাসা ও এতিমখানার ঠিক পূর্ব পাশে সংরক্ষিত বনভূমির আরএস গেজেটভুক্ত জমিতে আবু সাঈদ মন্ডল নামে এক ব্যক্তি ইটের দেওয়াল তুলে ১০ রুমের বিশাল বাড়ির ফাউন্ডেশন দিয়েছেন। পাশাগেটের মুন্সিটেকে জাহাঙ্গীর আলম তুলেছেন টিনশেড বাড়ি, আর বোর্ডমিল এলাকায় রেনুর বাড়ির পাশে জামাল নামের এক ব্যক্তি খাড়া করেছেন বহুতল ভবন। বিশ্বাসপাড়ার জিকজ্যাক মাঠের পশ্চিমে নুরজাহান নামের এক নারী এবং কালামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের রাস্তার মুখে সাইফুল নামের এক ব্যক্তি বনের জমি দখল করে বহুতল ভবন ও ঘর তুলেছেন।
সীমানা নির্ধারণ ছাড়াই ডং ব্যাং গেট সংলগ্ন মোল্লারটেকে জসিম উদ্দিন নামের এক ব্যক্তি শাল-গজারি বাগান ঘেঁষে দুইতলা ভবনের ফাউন্ডেশন দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, তাঁর এই নির্মাণাধীন বাড়ির সামনেই গজারি বনের একেবারে ভেতরে আরও ১০ থেকে ১২টি নতুন অবৈধ টিনশেড বাড়ি গড়ে উঠেছে!
এই জালিয়াতির আসল তথ্য ফাঁস হলো যখন অভিযুক্ত আবু সাঈদ মন্ডল ক্যামেরার সামনে কথা বললেন। বনের জমিতে বাড়ি নির্মাণের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “১৯৫৬ সালের দলিল থাকলেও আরএস রেকর্ড বনের নামেই রয়েছে। বিট অফিসের সঙ্গে কথা বলেই কাজ করছি। চন্দ্রা বিট কর্মকর্তা ইকবাল স্যার আপনার (প্রতিবেদকের) নম্বর দিয়ে বলেছেন, আপনার সঙ্গে কথা বলে কিছু দিয়ে সমাধান করতে!” অর্থাৎ, গণমাধ্যমের মুখ বন্ধ করতে বন কর্মকর্তা ঘুষের অফার দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
সুরিচালা এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা এই সিন্ডিকেটের দরদামও ফাঁস করে দিয়েছেন। তিনি জানান, “বনের জমিতে ঘর করতে টাকা-পয়সা ছাড়া অসম্ভব। আবু সাঈদ মন্ডলের কাজ দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। পরে চার লাখ টাকার চুক্তিতে কাজ শুরু হয়েছে। এর মধ্যে বন প্রহরী মিনহাজের মাধ্যমে ইতোমধ্যে দুই লাখ টাকা ক্যাশ দেওয়া হয়েছে, বাকি টাকা কাজ শেষ হলে দেওয়া হবে।” টাকা নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে অভিযুক্ত বন প্রহরী মিনহাজ হোসেন কোনো মন্তব্য না করে বিষয়টি এড়িয়ে যান। অন্যদিকে, চন্দ্রা বিট কর্মকর্তা ইকবাল হোসেন প্রতিবেদকের মুখোমুখি হয়ে ‘সামনাসামনি সাক্ষাৎ করার’ আহ্বান জানান এবং বরাবরের মতোই ‘যাচাই করে আইনি ব্যবস্থা’ নেওয়ার কথা বলেন।
ঢাকা বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক ও কালিয়াকৈর রেঞ্জ কর্মকর্তা শাহিদুল ইসলাম শাকিল অবশ্য দাবি করেছেন, “অভিযোগের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বনভূমির জমি জবরদখলের কোনো সুযোগ নেই।” কিন্তু প্রশ্ন হলো, যে বনের ভেতর চোখের সামনে বহুতল ভবন দাঁড়িয়ে গেল, তা দেখতে কি রেঞ্জ কর্মকর্তার দূরবীণ লাগে?
গাজীপুরের ফুসফুস খ্যাত এই শাল-গজারি বনাঞ্চল আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। স্থানীয় পরিবেশবাদীরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, দ্রুত টাস্কফোর্সের মাধ্যমে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা এবং ঘুষখোর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা না নিলে মানচিত্র থেকে চন্দ্রা বনবিট চিরতরে হারিয়ে যাবে।