পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার। তবে নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে যাবেন বলেও তিনি। সোমবার (২২ জুন) লন্ডনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে তিনি এই ঘোষণা দেন।
ক্ষমতায় আসার মাত্র দুই বছর পরই নেতৃত্ব ছাড়ার ঘোষণা দিলেন তিনি। বিদায়ী ভাষণে তিনি নিজের সরকারের সাফল্য তুলে ধরার পাশাপাশি দলের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার কথাও জানান।
স্টারমারের পদত্যাগের পুরো ভাষণ
ধন্যবাদ। ধন্যবাদ। দুই বছর আগে এই রাস্তা (ডাউনিং স্ট্রিট) ধরে হেঁটে আসা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে গর্বের মুহূর্ত। একটি নতুন লেবার সরকার। ১৪ বছরের মধ্যে প্রথম। বছরের পর বছর হতাশা ও নিরাশার পর আমাদের দেশের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল।
কোটি কোটি মানুষের জীবনকে আরও ভালোভাবে বদলে দেওয়ার সুযোগ, এটাই ছিল আমার রাজনীতিতে আসার উদ্দেশ্য। সেই জায়গায় পৌঁছানোর পথ সহজ ছিল না।
ছয় বছর আগে আমি এমন একটি লেবার পার্টির দায়িত্ব নিয়েছিলাম, যা রাজনৈতিক, আর্থিক ও নৈতিকভাবে দেউলিয়া ছিল। আমাকে বারবার বলা হয়েছিল, আমার দলের আর কোনো ভবিষ্যৎ নেই। বলা হয়েছিল, আমরা ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে গেছি। সাধারণ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা তো দূরের কথা, বড় জয়ও অসম্ভব। কিন্তু আমরা তাদের ভুল প্রমাণ করেছি, কারণ আমরা আমাদের দলকে বদলে দিয়েছি।
ইহুদিবিদ্বেষের বিষাক্ততা দূর করেছি, অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়ে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে এনেছি। আবারও এমন একটি দলে পরিণত হয়েছি, যে দল নিজের জাতীয় পতাকার পাশে গর্বের সঙ্গে দাঁড়ায়, তার বিরুদ্ধে নয়।
পরিবর্তনের এই কঠোর পরিশ্রমের একটি মাত্র উদ্দেশ্য ছিল, শুধু ক্ষমতার জন্য ক্ষমতা নয়, বরং ব্রিটেনকে আরও ভালো করে তোলা। আরও ন্যায্য দেশ গড়ে তোলা, যেখানে মর্যাদা ও সম্মান থাকবে; যেখানে সবাইকে দেখা হবে, সবাইকে মূল্য দেওয়া হবে। যেখানে সম্পদ ও সুযোগ-সুবিধা কেবল সুবিধাভোগী কয়েকজনের জন্য নয়, সবার জন্য থাকবে।
আর দেখুন, মাত্র দুই বছরে আমরা কী অর্জন করেছি। একটি শক্তিশালী অর্থনীতি, যা আমাদের সমকক্ষ দেশগুলোর তুলনায় দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা ক্ষমতায় আসার পর থেকে প্রতি মাসেই মজুরি বেড়েছে মূল্যস্ফীতির চেয়ে দ্রুত হারে। বিনিয়োগ নিশ্চিত হয়েছে, অবকাঠামো নির্মাণ চলছে। গত ১৭ বছরের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত হারে এনএইচএসের অপেক্ষমাণ রোগীর সংখ্যা কমেছে।
এক প্রজন্মের মধ্যে শ্রমিক ও ভাড়াটিয়াদের অধিকারে সবচেয়ে বড় উন্নয়ন হয়েছে। শীতল যুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি হয়েছে। ছোট নৌকায় অবৈধভাবে সীমান্ত পারাপার কমেছে, আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য ব্যবহৃত হোটেলগুলো বন্ধ হচ্ছে, তরুণদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সুরক্ষা দেওয়া হচ্ছে এবং আমার নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর কারণে পাঁচ লাখ শিশু দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছে।
বিশ্বে আমাদের সুনাম পুনরুদ্ধার হয়েছে। ব্রিটেন আবারও শালীনতা, সম্মান ও আইনের শাসনের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। আমরা বাণিজ্য চুক্তি করেছি, ইউক্রেনের পাশে দাঁড়িয়েছি, আমাদের মূল্যবোধ রক্ষা করেছি এবং ইউরোপের মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন করেছি। একটি লেবার সরকার যে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেই পরিবর্তনের জন্য লড়াই করেছে এবং সেই পরিবর্তন বাস্তবায়ন করেছে।
কিন্তু আমি জানি, এখন যে প্রশ্নটি করা হচ্ছে, তা আর এই নয় যে লেবার পার্টিকে বদলাতে, ক্ষমতায় আনতে ও কোটি মানুষের জীবন উন্নত করার কাজ শুরু করতে কে সবচেয়ে উপযুক্ত ছিল। সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর ইতোমধ্যেই মিলেছে।
এখন আমার দল যে প্রশ্ন করছে, তা হলো, পরের সাধারণ নির্বাচনে দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য আমি কি এখনও সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি? আমার পার্লামেন্টারি দলের সেই প্রশ্নের উত্তর আমি শুনেছি। এবং আমি সেই উত্তরকে মর্যাদার সঙ্গে গ্রহণ করছি।
আমি যে প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তা আমার প্রিয় দেশকে সবার আগে রাখার জন্যই নিয়েছি। সেই কারণেই আমি লেবার পার্টির নেতার পদ থেকে পদত্যাগ করছি।
আজ সকালে আমি মহামান্য রাজার সঙ্গে কথা বলেছি এবং তাকে আমার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছি। আমি লেবার পার্টির ন্যাশনাল এক্সিকিউটিভ কমিটিকে অনুরোধ করব, যাতে ৯ জুলাই থেকে মনোনয়ন গ্রহণ শুরু করে ও গ্রীষ্মকালীন বিরতির আগেই নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। প্রয়োজনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলে, সেপ্টেম্বর মাসে পার্লামেন্ট অধিবেশন শুরুর আগেই নতুন নেতা দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।
প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত আমি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে থাকব। এবং ক্ষমতা হস্তান্তর যেন সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হয়, সে জন্য আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।
আমার উত্তরসূরিকে আমি পূর্ণ ও নিঃশর্ত সমর্থন দেব। কারণ আমি জানি, তিনি এমন একটি ব্রিটেনের দায়িত্ব নেবেন, যা দুই বছর আগে আমি যে ব্রিটেন পেয়েছিলাম তার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ও ন্যায্য, ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও প্রস্তুত এবং লেবার পার্টিকে দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের সুযোগ এনে দিতে আরও সক্ষম।
আমি আমার সব বন্ধু ও সহকর্মীদের ধন্যবাদ জানাতে চাই, যারা গত ছয় বছর ধরে আমার পাশে ছিলেন এবং অসাধারণ নিষ্ঠা, সেবা ও সমর্থন দিয়েছেন। আমি ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের অসাধারণ কর্মীদের এবং আমাদের দেশের নিবেদিতপ্রাণ সিভিল সার্ভিস সদস্যদেরও ধন্যবাদ জানাই, যারা জনসেবায় নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন।
আর যখন আমি দেশের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব থেকে বিদায় নেব, তখন আমি আরও বেশি সময় দেব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে। আমার স্ত্রী ভিকের জন্য আরও ভালো স্বামী হওয়ার চেষ্টা করব। সুখে-দুঃখে তিনি আমার পাশে শক্ত ভিত্তির মতো ছিলেন। আর আমার প্রিয় সন্তানদের জন্য একজন আরও ভালো বাবা হওয়ার চেষ্টা করব। তারা আমার গর্ব, তারা আমার আনন্দ। আপনাদের সবাইকে অনেক ধন্যবাদ।
তথ্যসূত্র: বিবিসি