২০২৬ সালের মধ্যপ্রাচ্য এক নতুন সমীকরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে ফেরার পর ইরান-ইসরায়েল ছায়াযুদ্ধ সরাসরি সংঘাতে রূপ নিয়েছে। বর্তমানে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চললেও, রয়টার্স, নিউইয়র্ক টাইমস এবং আলজাজিরার বিশ্লেষণ বলছে—আমেরিকার সরাসরি অংশগ্রহণ এবং ট্রাম্পের সর্বোচ্চ চাপের নীতি সত্ত্বেও কৌশলগতভাবে ইরানই এই যুদ্ধে জয়ের পথে রয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেই ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং সরাসরি সামরিক হুমকির মাধ্যমে একটি নতুন বাস্তবতা চাপিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ইরান সেই চাপকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সরাসরি ইসরায়েলি ভূখণ্ডে আক্রমণ চালিয়েছে। এতে প্রমাণিত হয়েছে যে, ইসরায়েলের জন্য আমেরিকার সামরিক সহযোগিতা এবং ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান সত্ত্বেও তেলআবিবের নিরঙ্কুশ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন আর ওয়াশিংটনের একার পক্ষে সম্ভব নয়।
রয়টার্স এবং এএফপি-র সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান এই যুদ্ধে ইসরায়েলকে নাস্তানাবুদ করেছে স্যাচুরেশন অ্যাটাক কৌশল ব্যবহার করে। একসঙ্গে হাজার হাজার স্বল্পমূল্যের ড্রোন এবং হাইপারসনিক মিসাইল ছুড়ে ইসরায়েলের ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ক্লান্ত করে ফেলার কৌশল নিয়েছে ইরান।
ট্রাম্প প্রশাসন শতকোটি ডলারের সামরিক সহায়তা দিলেও ইসরায়েলের অর্থনৈতিক ভিত্তি আজ ধসে পড়ার মুখে। ইসরায়েলের ভেতরে ফুসে উঠছে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। জনগণও ক্ষুব্ধ নেতানিয়াহু প্রশাসনের ওপর।
ইসরায়েলের অর্থনীতি মূলত প্রযুক্তি এবং বৈদেশিক বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল। নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতে, দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ মানেই ইসরায়েলি রিজার্ভ সৈন্যদের কাজে যোগ দিতে না পারা এবং বন্দরগুলো অচল হয়ে যাওয়া। এর বিপরীতে, ইরানের অর্থনীতি দশকের পর দশক ধরে অবরোধের সাথে মানিয়ে নিয়েছে। আলজাজিরার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, একটি প্রলম্বিত যুদ্ধে ইসরায়েলি সমাজ অভ্যন্তরীণভাবে খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যেতে পারে, যা ইরানের ক্ষেত্রে হওয়ার সম্ভাবনা কম।
মিডল ইস্ট আই জোর দিয়ে বলেছে যে, ইসরায়েল বর্তমানে বিশ্বে কূটনৈতিকভাবে সবচেয়ে বেশি বিচ্ছিন্ন। গাজায় চলমান ধ্বংসযজ্ঞের কারণে আরব দেশগুলোর জনমত প্রবলভাবে ইসরায়েলবিরোধী। এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যদিও জর্ডান বা সৌদি আরব নিরাপত্তার খাতিরে কিছু সহায়তা দিচ্ছে, কিন্তু ইরানের সাথে সরাসরি যুদ্ধে তারা কখনোই ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের ফ্রন্টলাইন পার্টনার হবে না। ইরান সফলভাবে আরব দেশগুলোর সাথে তার কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়ন (বিশেষ করে চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি আরবের সাথে) করে ইসরায়েলকে একঘরে করে ফেলেছে।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে ইরানের স্ট্র্যাটেজিক পেশেন্স বা কৌশলগত ধৈর্যের কথা। ইরান একক বড় যুদ্ধের চেয়ে ইসরায়েলকে ছোট ছোট অনেকগুলো ফ্রন্টে ব্যস্ত রেখে ক্লান্ত করে ফেলার নীতি গ্রহণ করেছে। এই দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতা ইসরায়েলের সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে। গত এক বছরে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ইসরায়েলি নাগরিক দেশ ত্যাগ করে ইউরোপ বা আমেরিকায় পাড়ি জমিয়েছেন। একটি জাতির জন্য এটি দীর্ঘমেয়াদী পরাজয়ের প্রথম লক্ষণ, যখন তার জনগণ দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থা হারায়।
এপি-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা সরিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও পরিস্থিতির চাপে আরও বেশি সেনা মোতায়েন করতে বাধ্য হয়েছেন। ইরান সফলভাবে তার প্রক্সি নেটওয়ার্ক যেমন হিজবুল্লাহ, হুথি, ইরাকি মিলিশিয়াদের ব্যবহার করে ইসরায়েলকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে। ট্রাম্প প্রশাসন এখন বুঝতে পারছে যে, ইরানের সাথে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ মানেই বিশ্ব বাজারে তেলের দাম ৩০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়া, যা ট্রাম্পের নিজের দেশের অর্থনীতিকেই ধ্বংস করে দেবে। তার পদচ্যুতিও ঘটাতে এই বিধ্বংসী যুদ্ধ।
বর্তমানে যে যুদ্ধবিরতি চলছে, ইরানের জন্য এটি একটি কৌশলগত বিজয় হিসেবে দেখছে মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদ মাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস। ইরান এই সময়টিকে ব্যবহার করছে তাদের ক্ষয়িষ্ণু অস্ত্রভাণ্ডার পূর্ণ করতে এবং রাশিয়ার কাছ থেকে অত্যাধুনিক এস-৪০০ বা সুখোই-৩৫ এর মতো প্রযুক্তি সংগ্রহ করতে। অন্যদিকে, ইসরায়েল এই বিরতির মাঝেও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং রিজার্ভ সৈন্যদের অসন্তোষ সামলাতে রীতিমত হিমশিম খাচ্ছে।
মিডল ইস্ট আই এবং আলজাজিরা জোর দিয়ে বলেছে যে, গাজা এবং পরবর্তী সরাসরি যুদ্ধে ইসরায়েলের নৃশংসতা ট্রাম্পের আব্রাহাম অ্যাকর্ডস বা আরব-ইসরায়েল স্বাভাবিকীকরণ প্রক্রিয়াকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ইমেজ এবং আমেরিকার আন্তর্জাতিক নেতৃত্ব এখন খাদের কিনারে।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে আমেরিকা অনেক বেশি আক্রমণাত্মক হলেও ইরান তাদের অসম যুদ্ধের কৌশলে জয়ী হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার একক আধিপত্যের যুগ শেষ হওয়ার পথে, আর ইরান তার ভৌগোলিক আয়তন ও রাশিয়ার সাথে নতুন সামরিক অক্ষ তৈরি করে ইসরায়েলকে এক অস্তিত্ব সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এই যুদ্ধবিরতি কেবল চূড়ান্ত সংঘাতের আগের নীরবতা মাত্র।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি বর্তমানে এমন এক বিপজ্জনক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে, যা গত কয়েক দশকের মধ্যে দেখা যায়নি। সিরিয়ার দামেস্কে ইরানি কনস্যুলেটে ইসরায়েলি হামলা এবং তার জবাবে ইরানের সরাসরি ড্রোন ও মিসাইল আক্রমণ এই সংঘাতকে ছায়াযুদ্ধ থেকে বের করে সরাসরি যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। মিডল ইস্ট আই-এর বিশ্লেষণে যেমনটি বলা হয়েছে, আপাতদৃষ্টিতে ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতা বেশি মনে হলেও, একটি দীর্ঘমেয়াদী আঞ্চলিক যুদ্ধে ইসরায়েল এবং তার প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্রই কৌশলগতভাবে চূড়ান্ত পরাজয়ের মুখে পড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, কয়েক দশক ধরে ইসরায়েলের মূল প্রতিরক্ষা নীতি ছিল প্রতিরোধ। কিন্তু ছায়াযুদ্ধ থেকে বেরিয়ে এসে ইরানের সরাসরি হামলায় সেই প্রতিরোধের দেয়াল ভেঙে পড়েছে। ইরান এখন আর প্রক্সি বা ছায়াশক্তির ওপর নির্ভর না করে সরাসরি ইসরায়েলি ভূখণ্ডে সমানে আঘাত করে যাচ্ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, ইরান তার ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে, তাতে ইসরায়েলের বহুমুখী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (আয়রন ডোম, অ্যারো) শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না। একটি বড় আকারের যুদ্ধে ইরান যে কয়েক হাজার ড্রোন ও মিসাইল একসঙ্গে ছুড়বে, তখন ইসরায়েলের পক্ষে তা ঠেকানো যে অসম্ভব হয়ে পড়বে, তা কেউ কল্পনাও করেনি।
এএফপি এবং আলজাজিরার সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের জন্য সবচেয়ে বড় আতঙ্ক ইরান নয়, বরং লেবাননের হিজবুল্লাহ। রয়টার্সের একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, হিজবুল্লাহর কাছে প্রায় ১ লক্ষ ৫০ হাজার মিসাইল ও ড্রোন রয়েছে। যুদ্ধ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে উত্তর দিক থেকে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের গ্যালিলি অঞ্চল ও হাইফা বন্দরকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার সক্ষমতা রাখে। মিডল ইস্ট আই বলছে, ইরান ইসরায়েলের চারপাশে একটি রিং অফ ফায়ার বা আগুনের বলয় তৈরি করেছে। ইয়েমেনের হুথি, ইরাকের মিলিশিয়া এবং সিরিয়ার সরকারপন্থী বাহিনীগুলো সমন্বিত আক্রমণ অব্যাহত রাখলে ইসরায়েলের অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে পড়বে।
এই যুদ্ধে রাশিয়া এবং চীনের ভূমিকা যুক্তরাষ্ট্রকে কোণঠাসা করে দিচ্ছে। ইরান এখন আর একাকী নয়; সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা এবং ব্রিকস এর সদস্য হিসেবে ইরানের পেছনে রাশিয়া ও চীনের শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও সামরিক সমর্থন রয়েছে। রয়টার্সের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্য শেষ হয়ে যাচ্ছে। ইরান সফলভাবে প্রমাণ করেছে যে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তারা বিশ্ব রাজনীতিতে একটি বড় শক্তি হিসেবে টিকে থাকতে পারে।
সবশেষে, গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের নৃশংস সামরিক অভিযান তাদের আন্তর্জাতিক বৈধতাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। ইসরায়েল সামরিকভাবে গাজা ধ্বংস করলেও রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। এখন ইরানের সাথে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্ব জনমত পুরোপুরি ইসরায়েলের বিপক্ষে চলে যাবে। মিডল ইস্ট আই-এর বিশ্লেষণে যেমনটি বলা হয়েছে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র এখন এমন এক যুদ্ধে জড়িয়েছে যেখানে তাদের কোনো এক্সিট স্ট্র্যাটেজি বা বের হওয়ার পথ নেই।
রয়টার্স থেকে শুরু করে আলজাজিরা—সবগুলো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণে একটি বিষয় পরিষ্কার: আধুনিক যুদ্ধ এখন আর কেবল উন্নত প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে না। এটি এখন জনমত, অর্থনৈতিক সহনশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদী কৌশলের খেলা। ইরান তার ভৌগোলিক আয়তন, কৌশলগত মিত্র এবং প্রতিরোধের অক্ষ দিয়ে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে এমন এক ফাঁদে ফেলেছে, যেখান থেকে সামরিক বিজয় আসলেও কৌশলগতভাবে পরাজয় অনিবার্য। ইতিহাস সাক্ষী, ভিয়েতনাম বা আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে শক্তিশালী হয়েও শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারেনি। মধ্যপ্রাচ্যের এই জটিল সমীকরণের ফলাফল একই হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলামিস্ট, সমালোচক
ইমেইল: [email protected]