‘সরকারি হাসপাতালত পরীক্ষার তানে আসছিলাম বাহে, এখন কহেচে মেশিন নষ্ট!’— চোখের কোণে জল নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা বৃদ্ধ আজগর। শুধু আজগর আলীই নন, তার মতো হাজারও গরিব ও নিম্নবিত্ত রোগীর দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে উঠেছে ঠাকুরগাঁও ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের বাতাস। দীর্ঘ দুই মাস ধরে হাসপাতালের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তিনটি ল্যাবরেটরি মেশিন সম্পূর্ণ অচল হয়ে আছে। যান্ত্রিক ত্রুটি আর প্রয়োজনীয় রি-এজেন্টের সংকটে হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগ এখন কার্যত অকেজো।
জানা গেছে, হাসপাতালের ল্যাবরেটরিতে একটি ‘বায়োকেমিস্ট্রি অ্যানালাইজার’ এবং দুটি ‘হেমাটোলজি অ্যানালাইজার’ অচল অবস্থায় রয়েছে। এই মেশিন বন্ধ থাকায় লিভার ফাংশন (এলএফটি), কিডনি ফাংশন (কেএফটি), রক্তে গ্লুকোজ, ইউরিক অ্যাসিড, কোলেস্টেরল, বিলিরুবিন, ক্রিয়েটিনিন ও ইউরিয়াসহ প্রায় ১৫ থেকে ২০ ধরনের পরীক্ষা করা যাচ্ছে না। এতে লিভার বা হৃদরোগের মতো জটিল রোগের গাইডলাইন তৈরি করতে পারছেন না বলে জানালেন চিকিৎসকরা।
এদিকে রাসায়নিক রি-এজেন্টের অভাবে রক্তের সিবিসি পরীক্ষা করার দুটি মেশিনই বন্ধ রয়েছে। ফলে ডেঙ্গু, রক্তস্বল্পতা, প্লাটিলেটের অবস্থা কিংবা হিমোগ্লোবিনের মাত্রা জানতে রোগীদের হাসপাতালের বাইরে পাঠানো হচ্ছে। যে পরীক্ষা আধুনিক মেশিনে মাত্র দুই থেকে তিন মিনিটে নির্ভুলভাবে হওয়া সম্ভব, তা থমকে গেছে।
সরকারি হাসপাতালে যেসব পরীক্ষার জন্য রোগীদের মাত্র ৫০ থেকে ১৫০ টাকা খরচ হতো, সেই একই পরীক্ষা বাইরের বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে করতে রোগীদের গুনতে হচ্ছে ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা কিংবা তারও বেশি!
চিকিৎসা নিতে আসা সাইমা শুভ্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘মেশিন বিকল থাকার কারণে বাইরের ক্লিনিকে এসব পরীক্ষা করাতে হচ্ছে, যা খেটে খাওয়া মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষদের জন্য অত্যন্ত কষ্টসাধ্য।’
আরেক ভুক্তভোগী হৃদয় হাসান জানান, অতিরিক্ত খরচ বহন করতে না পেরে দিনমজুর ও কৃষকরা প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ছাড়াই শুধু ডাক্তারের মুখে শুনে ওষুধ নিয়ে বাড়ি ফিরছেন, যা তাদের জীবনকে ঠেলে দিচ্ছে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে!
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্যাথলজি বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘রি-এজেন্ট নাই, মেশিনও নষ্ট। প্রতিদিন শত শত রোগী ফিরে যাচ্ছেন। রোগীদের গালিগালাজ আর ক্ষোভের মুখে পড়তে হচ্ছে।’
এ অবস্থার বিষয়ে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. ফিরোজ জামান জুয়েল বলেন, ‘বায়োকেমিস্ট্রি মেশিনটি পরীক্ষা করে টেকনিশিয়ানদের নতুন মেশিন কেনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ঔষধাগারে চিঠি পাঠিয়েছি। আর হেমাটোলজি অ্যানালাইজার দুটি সচল করতে ঠিকাদারকে রি-এজেন্ট সরবরাহের জন্য বলা হয়েছে।’