সচিব পদের মূল্য ৮৬ কোটি!
প্রশাসনে ৫০ বা ১০০ কোটি টাকার চুক্তিতে আমলাদের শীর্ষ পদে বসার গুঞ্জন নতুন কিছু নয়। কিন্তু পদোন্নতির সেই বিপুল অর্থের ‘ফান্ড’ জোগাতে একজন অতিরিক্ত সচিব যখন বিভিন্ন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রীতিমতো লিখিত চুক্তি এবং ব্যাংকের ব্লাংক চেক গ্যারান্টি দিয়ে কোটি কোটি টাকা ধার নেওয়ার মিশনে নামেন, তখন তা কেবল নজিরবিহীন নয়, বরং পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রের জন্য চরম শঙ্কার বিষয়! তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) এম আবদুল ওয়াদুদের এমন এক গোপন ‘ফান্ড রেইজিং’ জালিয়াতির অকাট্য প্রমাণ ও নথি এখন নাগরিক প্রতিদিনের অনুসন্ধানী দল দ্য ব্লুপ্রিন্টের হাতে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এম আবদুল ওয়াদুদ সচিব পদে পদোন্নতি পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। তার মূল টার্গেট—দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় অথবা পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবের চেয়ার। কিন্তু এই শীর্ষ পদ বাগিয়ে নিতে পর্দার আড়ালে যে বিপুল পরিমাণ অর্থের লেনদেন প্রয়োজন, তা একার পক্ষে জোগাড় করা অসম্ভব দেখে তিনি বেছে নেন এক অভিনব ও চরম আপত্তিকর পথ। বিভিন্ন বেসরকারি বা কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অগ্রিম ফান্ড তোলার জন্য তিনি একের পর এক চুক্তি বা সম্মতিপত্র স্বাক্ষর করতে শুরু করেন।
৩৩ কোটির ঋণ, ১৮ মাসে ফেরত ৮৬ কোটি: দ্য ব্লুপ্রিন্টের হাতে এসেছে একটি চাঞ্চল্যকর দালিলিক প্রমাণ, সেখানে অতিরিক্ত সচিব আবদুল ওয়াদুদ নিজের অফিশিয়াল সিলসহ একটি ‘সম্মতিপত্র’ স্বাক্ষর করেছেন। নথি অনুযায়ী, তিনি একটি প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ৩৩ কোটি টাকা ঋণ নিতে চাচ্ছেন। সবচেয়ে অবিশ্বাস্য বিষয় হলো, এই ৩৩ কোটি টাকার বিপরীতে হাউজ কমিশন ও অন্যান্য খরচসহ মোট ৪৩ কোটি এবং এর দ্বিগুণ অর্থাৎ ৮৬ কোটি টাকা মাত্র ১৮ মাসের মধ্যে সুদে-আসলে ফেরত দিতে তিনি বাধ্য থাকবেন বলে লিখিত সম্মতি দিয়েছেন!
এখানেই জন্ম নিচ্ছে সবচেয়ে বড় অপরাধের প্রশ্ন? একজন সরকারি কর্মকর্তা তাঁর বৈধ বেতন-ভাতা দিয়ে কীভাবে মাত্র ১৮ মাসে ৮৬ কোটি টাকা পরিশোধ করবেন? সম্মতিপত্রে তিনি উল্লেখ করেছেন, এই অর্থ তিনি ‘কাজের মাধ্যমে’ পরিশোধ করবেন! অর্থাৎ সচিব পদ পাওয়ার পর নীতি বহির্ভূতভাবে সরকারি কাজ বা বড় বড় প্রজেক্ট পাইয়ে দিয়ে এই বিপুল অর্থ ধামাচাপা দেওয়ার তথ্য সাজানো হয়েছিল।
এই বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ লেনদেনের সিকিউরিটি বা গ্যারান্টি হিসেবে অতিরিক্ত সচিব আবদুল ওয়াদুদ ব্যবহার করেছেন তার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও ব্যক্তিগত নথি।
ডিজিটাল যুগে এই ধরনের সংবেদনশীল নথির সত্যতা নিয়ে যেন কোনো প্রশ্ন না ওঠে, সেজন্য নাগরিক প্রতিদিনের প্রযুক্তি দল আবদুল ওয়াদুদের এই সম্মতিপত্র, এনআইডির ওপর দেওয়া স্বাক্ষর ও সোনালী ব্যাংকের ফাঁকা চেকের কপিগুলো একাধিক আধুনিক এআই ও ডিপফেইক ডিটেকশান অ্যাপস ও ফরেনসিক টুলস দিয়ে নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করেছে। প্রতিটি টেস্টের ফলাফল নিশ্চিত করেছে, নথিতে থাকা সরকারি সিল, স্বাক্ষর ও চেকের পাতাগুলো শতভাগ আসল এবং সেখানে কোনো ধরনের এডিটিং বা প্রযুক্তির কারচুপি করা হয়নি।
সচিব পদের মতো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নীতিগত চেয়ারে বসার আগেই যদি একজন আমলা ৮৬ কোটি টাকার দেনার দায়ে ফেঁসে যান, তবে চেয়ারে বসার পর দেশের সম্পদ ও জনগণের ভাগ্যের কী দশা হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রশাসনের এই শীর্ষ কর্মকর্তার এমন প্রকাশ্য জালিয়াতির বিরুদ্ধে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত এখন সময়ের দাবি। এ বিষয়ে বেশ কয়েকবার এম আবদুল ওয়াদুদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্ঠা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।