বিশ্ববিদ্যালয় হলো জ্ঞানচর্চার সর্বোচ্চ পবিত্র স্থান, যেখানে মেধা আর যোগ্যতার ভিত্তিতে তৈরি হওয়ার কথা আগামীর ভবিষ্যৎ। কিন্তু সেই বিদ্যাপীঠেই যদি নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে, নথিপত্র গোপন করে পছন্দের প্রার্থীকে শিক্ষক বানানোর জন্য কার্পেট বিছিয়ে দেওয়া হয়, তবে মেধার মূল্যায়ন হবে কোথায়?
মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (মাভাবিপ্রবি) ফার্মেসি বিভাগে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ঘিরে উঠেছে এমনই এক অভিযোগ। তৎকালীন উপাচার্যের মেয়াদ শেষ হওয়ার ঠিক তিন দিন আগে, তড়িঘড়ি করে সমস্ত নিয়ম ভেঙ্গে এক প্রার্থীকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার নথিপত্র এখন নাগরিক প্রতিদিন-এর হাতে। পর্দার আড়ালে কীভাবে সাজানো হলো এই নিয়োগ?
ঘটনার সূত্রপাত গত বছরের ১২ আগস্ট প্রকাশিত একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিকে কেন্দ্র করে। নিয়ম অনুযায়ী, আবেদনপত্রগুলো যাচাই-বাছাইয়ের দায়িত্ব পড়ে ফার্মেসি বিভাগের প্ল্যানিং কমিটির ওপর। যাচাই করতে গিয়ে দেখা যায়, অন্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আবেদনকারী সাফিয়া আফরিনের আবেদনপত্রে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আবেদনের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংযুক্ত নেই। ফলে তার আবেদনটি ‘অসম্পূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত হয়। একই প্রশাসনিক ভুলের কারণে আরও সাতজন প্রার্থীর আবেদনপত্রও বাতিল ঘোষণা করে প্ল্যানিং কমিটি।
তৎকালীন বিভাগীয় চেয়ারম্যান ও প্ল্যানিং কমিটির সভাপতি প্রফেসর ড. মিজানুর রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দেন, অসম্পূর্ণ আবেদন নিয়ে কাউকে পরীক্ষার প্রবেশপত্র দেওয়া যাবে না। কিন্তু এখানেই ঘটে ম্যাজিক! প্ল্যানিং কমিটির সিদ্ধান্তকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, বাকি সাতজনকে বাতিলের খাতায় রেখেই, অদৃশ্য এক ক্ষমতায় শুধুমাত্র সাফিয়া আফরিনকে পরীক্ষার আসনে বসার বিশেষ সুযোগ করে দেওয়া হয়।
অভিযোগের আঙুল উঠেছে বর্তমান বিভাগীয় চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. আশরাফ আলী, তৎকালীন উপাচার্য প্রফেসর ড. মুহাম্মদ আনোয়ারুল আজিম আখন্দ ও সংস্থাপন শাখার এক কর্মকর্তার গোপন সমঝোতার দিকে। এই ত্রিমুখী চক্রের সরাসরি সহযোগিতায় সাফিয়া আফরিনের জন্য নিয়ম ভেঙে প্রবেশপত্র ইস্যু করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আইন বলছে, পরীক্ষার অন্তত এক সপ্তাহ আগে ডাকযোগে বা ই-মেইলে প্রবেশপত্র পাঠাতে হবে। কিন্তু এই নিয়োগে যেন সব আইনই নতুন করে লেখা হচ্ছিল! মে মাসের ৯ ও ১০ তারিখে প্রার্থীরা যখন প্রবেশপত্রের জন্য যোগাযোগ করেন, তখন সংস্থাপন শাখা থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়—‘রেজিস্ট্রারের স্বাক্ষর না থাকায় প্রবেশপত্র দেওয়া সম্ভব নয়।’
অথচ পরীক্ষার দিন সকালে পরীক্ষার্থীদের হাতে যে প্রবেশপত্র তুলে দেওয়া হয়, তা দেখে সবার চোখ চড়কগাছ! সেখানে দেখা যায়, গত ৯ মে ডেপুটি রেজিস্ট্রার সেটি স্বাক্ষর করে রেখেছিলেন! অর্থাৎ তথ্য গোপন করে নির্দিষ্ট এক প্রার্থীকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার জন্য সাধারণ পরীক্ষার্থীদের পরিকল্পিতভাবে অন্ধকারে রাখা হয়েছিল।
পরীক্ষার দিন সকাল ৯টায় যখন তড়িঘড়ি করে পরীক্ষার্থীদের হাতে প্রবেশপত্র গুঁজে দেওয়া হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই চরম মানসিক চাপে পড়েন প্রার্থীরা। আর এই সুক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক চালের নেপথ্য কারণ স্পষ্ট হয় পরের দিনগুলোতে। তৎকালীন উপাচার্যের মেয়াদ শেষ হওয়ার মাত্র তিন দিন আগে ১১ মে পুরো পরীক্ষা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয় এবং বিপুল বিতর্কের মাঝেই অসম্পূর্ণ আবেদনধারী সাফিয়া আফরিনকে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়!
এই অনিয়মের বিষয়ে জানতে নাগরিক প্রতিদিন-এর পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে অভিযুক্তরা একে অপরের দিকে কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি শুরু করেন। তৎকালীন উপাচার্য প্রফেসর ড. মুহাম্মদ আনোয়ারুল আজিম আখন্দ সব অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ দাবি করে দায় চাপান সংশ্লিষ্ট শাখার ওপর। তিনি বলেন, ‘প্রবেশপত্র সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে দেওয়া হয়, আমি কিছু জানি না।’ সেই সঙ্গে কুরিয়ারে প্রবেশপত্র না পাঠানোর অদ্ভুত ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘কুরিয়ারে দিলে অনেক সময় পৌঁছায় না, অতীতেও এমন অভিযোগ এসেছে।’
অন্যদিকে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে তৎকালীন বিভাগীয় চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মিজানুর রহমান বিস্ফোরক তথ্য দেন। তিনি জানান, ‘সাফিয়া আফরিনসহ আটজনের আবেদন অসম্পূর্ণ থাকায় আমরা ক্লিয়ারেন্স দেইনি। পরবর্তীতে সাফিয়া আফরিনের বিষয়ে বিভাগ থেকে যোগাযোগ করা হলেও রহস্যজনক কারণে সেই সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র বিভাগীয় চেয়ারম্যান ও প্ল্যানিং কমিটির সভাপতি হিসেবে আমাকেও দেখতে দেওয়া হয়নি!’
এদিকে ওই সময়ে ছুটিতে থাকার অজুহাত দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার প্রফেসর ড. সাজ্জাদ ওয়াহিদ জানান, এমন কোনো অনিয়ম নাকি তার নজরেই আসেনি!
একজনের জন্য লাল গালিচা আর বাকিদের জন্য নিয়মের কড়াকড়ি— বিশ্ববিদ্যালয়ের এই চরম বৈষম্য ও প্রশাসনিক নগ্নতায় ক্ষোভে ফুঁসছেন সাধারণ আবেদনকারীরা। ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্থাপন শাখা ও প্ল্যানিং কমিটির সব নথিপত্র জব্দ করে একটি নিরপেক্ষ উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন, সম্পূর্ণ প্রহসনমূলক নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল এবং এই জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে লিখিত আবেদন জানানো হয়েছে।