অনিয়ম অনিঃশেষ-৪
জাতীয় শিক্ষাক্রম এবং পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি), রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠানটি থেকে প্রতিবছর কোটি কোটি শিক্ষার্থীর হাতে বিনামূল্যে পৌঁছে দেওয়া হয় নতুন পাঠ্যবই। কিন্তু এই বিশাল কর্মযজ্ঞের অন্তরালে গত দেড় যুগ ধরে জেঁকে বসেছে এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট, যার মধ্যমণি অগ্রণী প্রিন্টার্স অ্যান্ড পাবলিকেশন্সের কর্ণধার কাউসার উজ জামান রুবেল।
এনসিটিবির অন্দরমহলে খোঁজ নিলেই শোনা যায় এক অবিশ্বাস্য আধিপত্যের গল্প, যেখানে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে পিয়ন পর্যন্ত সবাইকে চলতে হয় রুবেলের ইশারায়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকে শুরু হওয়া এই প্রভাব এতটাই প্রবল যে, তার অবাধ্য হলেই কর্মকর্তাদের বদলি বা হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, আওয়ামী লীগ সরকার পরিবর্তন হলেও এই সিন্ডিকেট এখনো বহাল। শুধু বদলেছে খোলস। নতুন করে আধিপত্য বিস্তারের জাল বুনছে এই সিন্ডিকেট। অগ্রণী প্রিন্টার্স সিন্ডিকেটেও অগ্রণী। অন্য কোনো সিন্ডিকেট তাদের ধারেকাছেও যেতে পারে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ১৭ বছর ধরে এনসিটিবির অধীনে পাঠ্যবই মুদ্রণের বড় বড় কাজগুলো একচেটিয়াভাবে বাগিয়ে নিচ্ছে অগ্রণী প্রিন্টার্স। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে সংস্থাটি কোনো বছরই মানসম্মত কাজ উপহার দিতে পারেনি। দরপত্র বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখিত কাগজের মান, ছাপার কালি বা সময়সীমা—কোনোটিই তোয়াক্কা করেনি তারা। বরং প্রতিবারই নিম্নমানের কাগজ ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় শিক্ষাখাতে এক প্রকার জালিয়াতি চালানো হয়েছে। এমনকি সক্ষমতার চেয়ে দশ গুণ বেশি কাজ নিয়েও তারা ইন্সপেকশন এজেন্ট ও মনিটরিং অফিসারদের ‘ম্যানেজ’ করে নিজেদের বিল পাশ করিয়ে নিয়েছে। এই দুর্নীতির শিকড় কতটা গভীর তা বোঝা যায় যখন দেখা যায়, ২০২৪ সালে মনিটরিং অফিসার দুলাল ভুঁইয়া টানা এক মাস নোয়াখালীতে রুবেলের প্রেসে অবস্থান করে বিধিবহির্ভূতভাবে তাকে সহায়তা করেছেন।
রুবেলের এই ক্ষমতার উৎস কেবল ব্যবসায়িক নয়, বরং রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক প্রভাবের এক জটিল মিশেল। আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী দীপু মনি ও নওফেলের সঙ্গে সখ্যতা এবং গণভবনের কর্মকর্তাদের নাম ভাঙিয়ে তিনি এক মনোপলি সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। এমনকি দুর্নীতির দায়ে আলোচিত পিয়ন জাহাঙ্গীরকেও নিজের আত্মীয় পরিচয় দিয়ে তিনি এনসিটিবিতে ভীতি ছড়াতেন। তবে ৫ আগস্ট পরবর্তী প্রেক্ষাপটে রুবেল ও তার ভাই হাসানুজ্জামান রবিন দ্রুতই নিজেদের পরিচয় বদলে ফেলেছেন। এখন তারা ফেনী ও নোয়াখালী অঞ্চলের হওয়ার সুবাদে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের ঘনিষ্ঠ পরিচয় দিয়ে মুদ্রণ শিল্পে নিজেদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। মুদ্রণ শিল্প সমিতিতে (বামুশিস) ভোটারদের ল্যাপটপ ও ট্যাব দিয়ে প্রভাবিত করে পদ দখল করার অভিযোগও তাদের পিছু ছাড়ছে না।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনাটি ঘটে ২০২৪ শিক্ষাবর্ষের তৃতীয় শ্রেণির ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা বইয়ের মুদ্রণে। অগ্রণী প্রিন্টার্সে ছাপা হওয়া এই বইয়ের কভার পৃষ্ঠার ভেতরে হিন্দু দেবতার ছবি ছাপানো হয়, যা দেশের স্পর্শকাতর অঞ্চলগুলোতে দাঙ্গার উসকানি দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করে। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার এই চরম অবহেলার ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও এক অদৃশ্য শক্তিতে তা ধামাচাপা পড়ে যায়। অভিযোগ রয়েছে, এনসিটিবির উপ-উৎপাদন নিয়ন্ত্রক আব্দুর রশিদ ও উৎপাদন নিয়ন্ত্রক সাইদুর রহমান মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে সেই প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখতে দেননি। যারা এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে আপস করতে রাজি হননি, যেমন সাবেক সদস্য প্রফেসর লুৎফর রহমান বা মির্জা তারিক হিকমত, তাদের প্রভাবশালী মহলের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক বদলি করিয়ে নিজের আধিপত্যের বার্তা দিয়েছেন রুবেল।
বর্তমানে রাজধানীর নয়াপল্টনের চায়না টাউনের ২৩ তলায় বিলাসবহুল অফিস খুলে রুবেল ও তার ভাই মুদ্রণ শিল্পের সব গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সিদ্ধান্ত আগেভাগেই জেনে যান এবং সেই অনুযায়ী সবকিছু সাজান।
রাজধানীর নয়াপল্টনে অবস্থিত সিটি হার্ট সেন্টারের ৫ম তলায় অবস্থিত বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির অফিসে গিয়ে খোঁজ নিলে এসব বিষয় নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি কেউ।
সূত্রমতে, এনসিটিবির সাবেক সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক লুৎফর রহমান ঘুষ নিতে রাজি না হওয়ায় তাকে কুমিল্লায় বদলি করানো হয়। এ বিষয়ে জানতে গত ২ এপ্রিল বৃহস্পতিবার বিকেলে এনসিটিবির তৎকালীন সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক লুৎফর রহমানকে ফোন করা হলে তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি। পরে ২০ এপ্রিল ৪টা ৫০ মিনিটে তাকে আবারও ফোন করা হয়, কিন্তু তিনি ফোনটি রিসিভ করেননি। পরে এসএমএস করে আবার ফোন করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
গত ২ এপ্রিল বৃহস্পতিবার বিকেলে এনসিটিবির সাবেক সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক সাইদুর রহমানকে ফোন করা হলে তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি। পরে ২০ এপ্রিল ৪টা ৫৭ মিনিটে তাকে আবারও ফোন করা হলে ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
গত ২ এপ্রিল বৃহস্পতিবার বিকেলে এনসিটিবির তৎকালীন উপ-উৎপাদন নিয়ন্ত্রক আব্দুর রশিদকে ফোন করে পাওয়া যায়নি। পরে ২০ এপ্রিল ৪টা ৫৮ মিনিটে তাকে পুনরায় ফোন করা হলে ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
গত ২ এপ্রিল বৃহস্পতিবার বিকেলে এনসিটিবির তৎকালীন সচিব শাহ মুহম্মদ ফিরোজ আল ফেরদৌসকে ফোন করা হয়। তদন্ত কমিটির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি নাগরিক প্রতিদিনকে বলেন, ‘বিষয়টি আমার মনে নেই। তখন তো তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার কথা।’ পরে আবার এ বিষয়ে কথা বলতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমাকে আর ফোন করে লাভ নেই।’
এসব বিষয়ে জানতে ২০ এপ্রিল বিকেল ৫টা ১০ মিনিটের দিকে ২০২৪ সালের পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণের সময় দায়িত্বে থাকা মনিটরিং অফিসার দুলাল ভুঁইয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তার ফোনটিও বন্ধ পাওয়া যায়।
ফোন ধরেননি এনসিটিবির বর্তমান সচিব প্রফেসর ড. শাহতাব উদ্দিনও। ২০ এপ্রিল ৫টা ২০ মিনিটের দিকে ফোন করা হলে তিনি ফোনটি রিসিভি করেননি। পরে এসএমএস করে ৫টা ২৪ মিনিটে আবার ফোন করা হলে তিনি সেই ফোনটিও রিসিভ করেননি।
এনসিটিবির বর্তমান চেয়ারম্যান মো. মাহবুবুল হক পাটওয়ারীকে ২০ এপ্রিল ৫টা ৩৫ মিনিটের দিকে ফোন করা হলে তিনিও রিসিভ করেননি। পরবর্তী সময়ে এসএমএস করেও তার সাড়া মেলেনি।
সব মিলিয়ে এনসিটিবি আজ এক ব্যক্তির সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। অনেকে বলছেন, এই চক্রটি যেভাবে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের ভোল পাল্টাতে পারদর্শী, তাতে রাষ্ট্রীয় এই সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা বজায় রাখা বর্তমান প্রশাসনের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।