জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) মনোনীত প্রার্থী মনিরা শারমিনের প্রার্থিতা নিয়ে আইনি জটিলতা দেখা দিয়েছে। সরকারি চাকরি ছাড়ার তিন বছর পূর্ণ না হওয়ায় তিনি প্রার্থী হতে পারবেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
১১ দলীয় জোট সূত্রে জানা গেছে, সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিনকে মনোনীত করা হয়েছে। তবে তিনি ২০২৫ সালে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চাকরি থেকে পদত্যাগ করেন। ফলে তার চাকরি ছাড়ার পর এখনো তিন বছর পূর্ণ হয়নি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন প্রার্থীদের জন্য যে আইনি শর্ত নির্ধারণ করেছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো সরকারি বা সামরিক চাকরি থেকে অবসর বা পদত্যাগের পর তিন বছর পূর্ণ না হলে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া যাবে না। এই বিধান সংবিধান ও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী নির্ধারিত।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর ১২ (১) (চ) ধারা অনুযায়ী—কোনো ব্যক্তি প্রজাতন্ত্রের বা কোনো সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষের বা প্রতিরক্ষা কর্মবিভাগের চাকরি থেকে পদত্যাগ করলে বা অবসর গ্রহণ করলে, সেই পদত্যাগ বা অবসরের তারিখ থেকে কমপক্ষে ৩ (তিন) বছর অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার যোগ্য হবেন না।
সরকারি কর্মকর্তাদের অবসরের পর এই ৩ বছর অপেক্ষার বিধানটি চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে ইতিপূর্বে রিট করা হয়েছিল। রিটকারীদের যুক্তি ছিল, এটি নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। তবে উচ্চ আদালত এবং বর্তমান আইনি কাঠামো অনুযায়ী এখন পর্যন্ত ৩ বছরের এই শর্তটি বহাল রয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংরক্ষিত নারী আসনের ক্ষেত্রেও এই বিধান প্রযোজ্য। কারণ সংরক্ষিত আসনের সদস্যরাও সংসদ সদস্য হিসেবে একই সাংবিধানিক কাঠামোর আওতায় পড়েন। ফলে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত না হলেও যোগ্যতার শর্তে কোনো ছাড় নেই।
এ বিষয়ে এখনো নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
এ বিষয়ে এনসিপির দলীয় একটি সূত্র জানিয়েছে, বিষয়টি আইনগতভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
এ নিয়ে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন জানান, তিনি এ বিষয়ে উত্থাপিত আইনি প্রশ্নগুলো দেখেছেন এবং বিষয়টি নিয়ে কিছু ভুল ব্যাখ্যা প্রচার হচ্ছে বলে মনে করেন। তার মতে, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ বা আরপিও সাধারণভাবে যে বিধান নির্ধারণ করেছে, তা সংরক্ষিত নারী আসনের ক্ষেত্রে সরাসরি একইভাবে প্রযোজ্য নয়। কারণ সাধারণ আসনের মতো এখানে সরাসরি নির্বাচন হয় না, বরং দলীয়ভাবে মনোনয়ন দিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচন করা হয়। ফলে এই ক্ষেত্রে অনেক বিধানই তুলনামূলকভাবে শিথিল থাকে।
তিনি মনে করেন, এ বিষয়টিকে নেতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ নেই, বরং এটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ এবং জোটের স্বার্থে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা উচিত। এনসিপি চায়, সংসদে এমন প্রতিনিধিত্ব বাড়ুক যারা সংস্কার ও গণরায়ের পক্ষে কথা বলবে।
মনিরা শারমিন আরও বলেন, এনসিপির মূল অবস্থান হলো নারীদের সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদে আনা। এ লক্ষ্যে দলটি বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ ও প্রচার চালাতে আগ্রহী। ভবিষ্যতে সংরক্ষিত আসনের পরিবর্তে অন্তত কিছু আসনে সরাসরি নির্বাচনের সুযোগ তৈরি করার জন্য সংসদে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন বলেও তিনি মনে করেন।
মনিরা আরও জানান, সংসদে যেসব নারী সদস্য যাবেন, তাদের ওপর এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থাকবে।
জোটের আসন বণ্টন প্রসঙ্গে মনিরা শারমিন বলেন, বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে আসন সংখ্যার তুলনায় কম প্রতিনিধিত্ব পেয়েও কিছু দল নারীদের সংসদে পাঠানোর ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। তিনি এটিকে একটি ইতিবাচক রাজনৈতিক দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখেন এবং আশাপ্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ আরও বাড়বে।
উল্লেখ্য, জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা ৫০টি। সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এনসিপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় জোট মোট ৭৭টি আসন পেয়েছে। সে হিসেবে সংরক্ষিত ৫০টি আসনের মধ্যে জোটটি পাচ্ছে ১৩টি আসন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মোর্চা একটি আসন পাবে। এছাড়া বিএনপি পাচ্ছে ৩৬টি আসন।
সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যরা সাধারণ আসনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হন। ফলে প্রার্থিতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে সাংবিধানিক ও আইনি শর্তগুলো সমানভাবে প্রযোজ্য হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন বলেন, আগে সরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অবসরে থাকার বাধ্যবাধকতা ছিল, সাধারণত দুই বা তিন বছর পূর্ণ হওয়ার পরই তারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারতেন। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় এ বিধানে কিছু পরিবর্তন আনা হয়ে থাকতে পারে বলে তিনি মনে করেন, যদিও বিষয়টি সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত নন।
তিনি আরও বলেন, যদি এ নিয়ম এখনো বহাল থাকে, তাহলে তা প্রার্থিতার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলবে। আর যদি নিয়মটি বাতিল বা শিথিল করা হয়, তাহলে এ ধরনের ক্ষেত্রে কোনো বাধা থাকার কথা নয়।
তবে বাংলাদেশের সংবিধানে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২-এ উল্লেখ আছে, কোনো ব্যক্তি সরকারি চাকরিতে থাকলে বা অবসর/পদত্যাগের পর ৩ বছর পার না হলে তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ নাগরিক প্রতিদিনকে জানিয়েছেন, সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগ বা অবসরের পর তিন বছর না পার হলে নির্বাচনে অংশগ্রহণের যে বিধান রয়েছে, তা সংরক্ষিত নারী আসনের প্রার্থীদের ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য হবে।