২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি, ইরানের মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় শতাধিক শিশু নিহত হয়। তারা তাদের শ্রেণিকক্ষে ছিল। কেউ লিখছিল, কেউ মন দিয়ে শুনছিল, কেউ হয়তো স্বপ্ন দেখছিল তার ভবিষ্যৎ নিয়ে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে সেই শ্রেণিকক্ষ পরিণত হয় মৃত্যুপুরীতে।
এই ঘটনা আমাদের কেবল একটি যুদ্ধের খবর দেয় না, এটি আমাদের বিবেককে গভীরভাবে প্রশ্ন করে। শিশু হত্যা কোনো যুদ্ধের অংশ হতে পারে না। এটি কোনো কৌশল নয়। এটি কোনো ভুলও নয়, যাকে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বলে পাশ কাটানো যায়। এটি ভবিষ্যৎ হত্যা। এটি শিক্ষা হত্যা। এটি মানবতার বিরুদ্ধে এক নির্মম অপরাধ।
এই ঘটনার পর প্রশ্নটি আর কেবল রাজনৈতিক নয়, এটি গভীরভাবে নৈতিক। যদি যুদ্ধের ফল হয় শিশুদের মৃত্যু, তাহলে কি আত্মসমর্পণই অধিক মানবিক পথ?
ইতিহাস আমাদের সামনে দ্বৈত বাস্তবতা তুলে ধরে। মেলোসের অবরোধ দেখায় প্রতিরোধ কখনো ধ্বংস ডেকে আনে। হিরোশিমা ও নাগাসিকায় পারমাণবিক বোমা হামলা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যুদ্ধের চরম নিষ্ঠুরতা।
আবার উইন্টার ওয়ারের পর আপাত সমঝোতা একটি রাষ্ট্রকে টিকে থাকতে সাহায্য করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ প্রমাণ করে, কখনো আত্মসমর্পণ মানে অস্তিত্ব হারানো এবং তখন প্রতিরোধই একমাত্র পথ। এই বাস্তবতায় দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর সামনে সাধারণত চারটি পথ খোলা থাকে।
প্রথমত প্রতিরোধ। এটি স্বাধীনতা ও মর্যাদা রক্ষার পথ। কিন্তু এর মূল্য অত্যন্ত বেশি এবং প্রায়ই নিরীহ মানুষের জীবন দিয়ে সেই মূল্য পরিশোধ করতে হয়। দ্বিতীয়ত আপাত আত্মসমর্পণ। এটি সময় কেনার একটি কৌশল। এতে জীবন রক্ষা করা যায়, পুনর্গঠন সম্ভব হয় এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
তৃতীয়ত কূটনৈতিক ভারসাম্য। যুদ্ধ এড়িয়ে কৌশল ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মাধ্যমে টিকে থাকা অনেক সময় দুর্বল রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হয়ে ওঠে। চতুর্থত পূর্ণ আত্মসমর্পণ। এটি তাৎক্ষণিকভাবে মৃত্যু থামাতে পারে। কিন্তু একটি জাতির স্বাধীনতা, পরিচয় ও আত্মমর্যাদা হারানোর ঝুঁকি তৈরি করে।
বর্তমান বিশ্বে ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ এই চারটি পথের কঠিন বাস্তবতাকে আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরছে। কিন্তু মিনাবের শিশুদের মৃত্যু আমাদের একটি স্পষ্ট সীমারেখা টেনে দেয়। কোনো রাষ্ট্রের সম্মান, কোনো কৌশল, কোনো মতভেদ শিশুদের প্রাণ নেওয়ার বৈধতা দিতে পারে না।
এই প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের সীমাবদ্ধতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশ্বশান্তির প্রতিশ্রুতি থাকা সত্ত্বেও, বাস্তবে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থই প্রায়শই সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। ফলে প্রশ্ন থেকেই যায়, মানবতার রক্ষক কে?
অতএব আজকের মূল প্রশ্নটি ‘লড়ব, না আত্মসমর্পণ করব’—এই সরল দ্বন্দ্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, কোন সিদ্ধান্ত মানুষের জীবন রক্ষা করে, আর কোন সিদ্ধান্ত ভবিষ্যৎকে ধ্বংস করে।
পবিত্র কুরআনের বাণী আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, যে একজন মানুষকে বাঁচায়, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকেই বাঁচাল।
আজ এই বাণী নতুনভাবে উচ্চারিত হওয়া প্রয়োজন। কারণ একটি শিশুর মৃত্যু মানে শুধু একটি প্রাণ হারানো নয়, একটি সম্পূর্ণ ভবিষ্যৎ নিঃশেষ হয়ে যাওয়া।
লেখক: শিক্ষক