সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, অবৈধ সম্পদ অর্জন, ক্ষমতার অপব্যবহার করে যে কাউকে মামলায় ফাঁসিয়ে হয়রানিসহ এমন বহু অভিযোগ উঠেছে এক জেলা প্রশাসকের (ডিসি) বিরুদ্ধে। শুধু তা-ই নয়, এই দুর্নীতি-অনিয়মে তাকে যোগ্য সঙ্গ দিয়ে যাচ্ছেন তার স্ত্রী বেগম মিনারা নাজমীন (১৫৯৪২)। এই দুজনের রোশানল থেকে বাচঁতে এবং হয়রানীর প্রতিকার চেয়ে প্রধানমস্ত্রীর দপ্তর, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রনালয়ে লিখিত অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সাবেক এক লেফটেন্যান্ট কমান্ডার, যিনি নুরুল করিম ভুইয়ার স্ত্রী মিনারা নাজমীনের আপন ভাই।
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই দুই বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে দাপুটে কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। তারা দুজনই বিসিএস ২৫ ব্যাচের প্রশাসন ক্যাডারে চাকরিতে ঢোকেন।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তাদের অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ অনুসন্ধানের মধ্যেই গাজীপুর জেলায় ডিসি হিসেবে পদায়ন পেয়েছেন নুরুল করিম ভূইয়া (১৫৮৫৬)। আর তার স্ত্রী বেগম মিনারা নাজমীনও আরেকটি জেলায় পদায়ন পেতে তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন। অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে ফাইলের পর ফাইল দুদকে জমা হলেও কেউ এ নিয়ে তদন্ত করতে মাঠে নামে না।
দুদকে তাদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সরকারী অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে অনুসন্ধান চলছে ধীর গতিতে। এমন পর্যায়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব নুরুল করিম ভূঁইয়াকে গাজিপুরের জেলা প্রশাসক হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে। এই খবরে প্রশাসেনের অনেকে বিস্মিত হয়েছেন। তার স্ত্রী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক শাখা-১-এর উপসচিব মিনারা নাজমীনও জেলায় পদায়ন পাওয়ার জোর তৎবির চালাচ্ছেন। এ দুই কর্মকর্তার সম্পত্তিগত দ্বন্দ্বে স্বজনদের হয়রানি করতে পুলিশ থেকে শুরু করে বিচারালয় পর্যন্ত প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে।
দুদকের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও অবৈধ সম্পদের অভিযোগে নুরুল করিম ভূইয়া ও তার স্ত্রী মিনারার বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নেমেছে দুদক। ইতোমধ্যে কমিশন এ বিষয়ে অনুসন্ধান কর্মকর্তাও নিয়োগ করেছে। নিয়োগ পাওয়া অনুসন্ধান কর্মকর্তা দুদকের সহকারী পরিচালক সৌরভ দাস ওই দুই উপসচিবের স্থাবর ও অস্থাবর অবৈধ সম্পদের খোঁজে বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি পাঠিয়েছেন। তবে নাম না প্রকাশ করে প্রশাসনের একটি সূত্র জানাচ্ছে, তদন্তে ধীর গতি চলছে। কারণ কেউই তাদেরকে ঘাটাতে চায় না।
সূত্র জানিয়েছে, ফেনীর বাসিন্দা নুরুল করিম ভূইয়া বিসিএস ২৫ ব্যাচে সুপারিশপ্রাপ্ত হন। চাকরি জীবনে বিভিন্ন উপজেলায় সহকারী ভূমি কমিশনার, সিনিয়র ভূমি কমিশনার, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যানের একান্ত সচিব ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এরপর সিনিয়র সহকারী সচিব পদে বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপপরিচালক হিসেবেও কাজ করেছেন।
২০১৭ সালে তিনি জাপানে উচ্চশিক্ষার একটি কোর্সে অংশগ্রহণের জন্য যান। একই বছর আরেকটি কোর্সের জন্য থাইল্যান্ডেও যান। ২০১৭ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৮ সালের ৮ জুন পর্যন্ত পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের জন্য যুক্তরাজ্যের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে দেশের বাইরে অবস্থান করেন। এরপর ২০২২ সালের ১ আগস্ট ‘ডক্টর অব ফিলোসফি ইন কমিউনিকেশন’ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিগ্রি অর্জনের জন্য ভর্তি রয়েছেন।
কিন্তু উচ্চশিক্ষার নামে নুরুল করিম ও তার স্ত্রী দীর্ঘ ৮ বছর ধরে আমেরিকায় অবস্থান করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সরকারি অর্থে সেখানে আয়েশী জীবনযাপন করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। আমেরিকার মতো ব্যয়বহুল দেশে বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে বসবাস এবং সন্তানের পড়াশোনার ব্যয় বহন করার মতো অর্থ সরকারি চাকরি করে কীভাবে সম্ভব—তা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন।
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিভিন্ন উপজেলায় ভূমি কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা থাকাকালে ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল অর্থ অর্জন করেন নুরুল করিম। এ ছাড়া দায়িত্বে থাকা বিভিন্ন দপ্তরে থেকেও ঘুষ বাণিজ্য ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
দুদকের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে তৎকালীন পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের উপসচিব (বর্তমানে গাজীপুরের জেলা প্রশাসক) নুরুল করিম ভূইয়া এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগের উপসচিব (বর্তমানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক শাখা-১) মিনারার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক। অনুসন্ধান কর্মকর্তা হিসেবে দুদকের ঢাকা জেলা সমন্বিত কার্যালয়-১ এর সহকারী পরিচালক সৌরভ দাসকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি ইতোমধ্যে বিভিন্ন দপ্তরে তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ভূমি অফিস ও সাবরেজিস্ট্রি অফিসে তাদের নামে-বেনামে সম্পদের তথ্য চাওয়া হয়েছে।
দুদকের একজন কর্মকর্তা জানান, উপসচিব নুরুল করিম ভূইয়া ও তার স্ত্রী মিনারা নাজনীনের বিরুদ্ধে আসা অভিযোগ অনুসন্ধানাধীন। তাদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। সব তথ্য পাওয়ার পর যাচাই-বাছাই শেষে সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিশ দেওয়া হবে।
একটি অভিযোগে বলা হয়েছে, নুরুল করিম ভূইয়া সরকারি চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই ঘুষ, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন। বটিয়াঘাটা উপজেলায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) থাকাকালে ঘুষের বিনিময়ে সরকারি জমি বরাদ্দ দিয়েছেন। ঘুষের টাকায় ঢাকার জোয়ার সাহারা এলাকায় নিসর্গ সমবায় সমিতিতে কয়েক কাঠা জমি ক্রয় করেন। এ ছাড়া সরকারি জমিতে রিসোর্ট নির্মাণের জন্য অবৈধভাবে লিজ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
ডিসি নূরুল সরকারি চাকরিতে থেকে জমি কেনাবেচার দালালি করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এম এন হোমস নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্র্যাক ব্যাংকে হিসাব খুলে ঘুষের অর্থ লেনদেন করতেন। তিনি শাশুড়ির নামে এফডিআর ও সঞ্চয়পত্রে বিপুল অর্থ সঞ্চয় করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফেনীর গ্রামের বাড়িতে কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ করেছেন।
দুদকের এক কর্মকর্তা জানান, নুরুল করিম ভূইয়া আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দোহার উপজেলার ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার স্ত্রী মিনারাও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্বে ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে তারা বিপুল সম্পদের মালিক হন। আরও অভিযোগ রয়েছে, বিদেশে উচ্চশিক্ষার নামে তারা দীর্ঘ সময় অবস্থান করে বিলাসী জীবনযাপন করেছেন এবং অবৈধ অর্থ বিদেশে পাচার করেছেন। পরবর্তীতে দেশে ফিরে তারা মামলা বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েন। সম্পত্তিগত বিরোধে মিনারা নাজনীন তার ভাইকে মামলায় জড়িয়ে হয়রানি করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ ব্যাপারে জানতে নুরুল করিম ভূইয়াকে ফোন করা হলে তিনি নাগরিক প্রতিদিনকে বলেন, ‘এগুলো নিয়ে বলার কিছু নেই। এগুলো পুরোপুরি ভুল।’
এদিকে অনুসন্ধান কর্মকর্তা দুদকের ঢাকা জেলা সমন্বিত কার্যালয়-১-এর সহকারী পরিচালক সৌরভ দাস বলেন, ‘নুরুল করিমের বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে।’
অপেক্ষা করুন পরবর্তী পর্বের জন্য...