অপুষ্টি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং দুর্যোগজনিত ঝুঁকির মতো বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করে রাজধানীতে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘নরিশিং রেজিলিয়েন্স: বিল্ডিং আ হেলদিয়ার বাংলাদেশ টুগেদার’ শীর্ষক জাতীয় কর্মশালা। অ্যাকশন কন্ট্রে লা ফেইম (এসিএফ) ও ফ্রেন্ডশিপ-এর যৌথ উদ্যোগে ঢাকার হোটেল আমারিতে আয়োজিত এ কর্মশালায় সরকারের নীতিনির্ধারক, উন্নয়ন সহযোগী, গবেষক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীরা অংশ নেন।
কর্মশালার উদ্বোধনী বক্তব্যে এসিএফ-এর ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর তপন কুমার চক্রবর্তী বলেন, টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পুষ্টিকে জাতীয় অগ্রাধিকারের কেন্দ্রে রাখতে হবে। অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য ও প্রেক্ষাপট তুলে ধরে ফ্রেন্ডশিপ-এর ডেপুটি ডিরেক্টর (হেলথ) ডা. সানাউল বাসার বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার কারণে দেশের ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর পুষ্টি পরিস্থিতি নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে, যা মোকাবিলায় প্রয়োজন সমন্বিত পদক্ষেপ।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকল্প পরিচালক ডা. মো. রেজাউর রহমান এবং বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ এস এম কামরুল হাসান। কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন জাতীয় পুষ্টি সেবা (আইপিএইচএন)-এর পরিচালক ডা. মোহাম্মদ ইউনুস আলী।
দিনব্যাপী কর্মশালায় দেশের বর্তমান পুষ্টি পরিস্থিতি, জাতীয় পুষ্টিনীতি বাস্তবায়নের অগ্রগতি, বৈশ্বিক পুষ্টি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশের অবস্থান এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পুষ্টি ঝুঁকি বৃদ্ধির বিষয়গুলো নিয়ে তথ্যসমৃদ্ধ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আইপিএইচএন-এর উপ-পরিচালক ডা. রওশন জাহান আখতার আলো দেশের পুষ্টি পরিস্থিতির সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরেন। বাংলাদেশ জাতীয় পুষ্টি পরিষদের (বিএনএনসি) উপ-পরিচালক ডা. মো. আখতার ইমাম জাতীয় পুষ্টিনীতি ও বৈশ্বিক অঙ্গীকারের সঙ্গে বাংলাদেশের অগ্রগতির সামঞ্জস্য নিয়ে আলোকপাত করেন।
কুড়িগ্রাম জেলার পুষ্টি পরিস্থিতি ও মাঠপর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন জেলার সিভিল সার্জন ডা. স্বপন কুমার বিশ্বাস। অন্যদিকে, এসিএফ পরিচালিত স্মার্ট সার্ভের প্রাথমিক ফলাফল উপস্থাপন করে ডা. মো. আবুল হাসান বলেন, জলবায়ু-সংবেদনশীল অঞ্চলে অপুষ্টি মোকাবিলায় আরও কার্যকর ও লক্ষ্যভিত্তিক উদ্যোগ প্রয়োজন।
কর্মশালায় স্থানীয় খাদ্যভিত্তিক পদ্ধতির মাধ্যমে তীব্র অপুষ্টি ব্যবস্থাপনার সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণালব্ধ তথ্য উপস্থাপন করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের চেয়ারম্যান ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. শাখাওয়াত হোসেন। একই বিষয়ে আইসিডিডিআর,বি-এর গবেষণার ফলাফল তুলে ধরেন বিজ্ঞানী ডা. মো. মুনিরুল ইসলাম। গবেষকরা স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য ও পুষ্টিকর খাদ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি করে অপুষ্টি মোকাবিলার সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন।
কর্মশালার অন্যতম আকর্ষণ ছিল ‘কালেকটিভ অ্যাকশন ফর নিউট্রিশনাল ওয়েল-বিয়িং অ্যান্ড রেজিলিয়েন্ট কমিউনিটিজ’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনা। আলোচনায় জনস্বাস্থ্য পুষ্টি ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় পুষ্টি সহনশীলতা অন্তর্ভুক্তি, গবেষণাভিত্তিক নীতিনির্ধারণ, একাডেমিয়ার ভূমিকা এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক পুষ্টি কর্মসূচির টেকসই অর্থায়নের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। আলোচকরা একমত হন যে, অপুষ্টি মোকাবিলায় শুধু স্বাস্থ্য খাত নয়, বরং কৃষি, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন খাতের সমন্বিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আবহাওয়াবিদ এস এম কামরুল হাসান বলেন, দুর্যোগ ও অপুষ্টি একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই আগাম সতর্কবার্তা দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং কমিউনিটিকে প্রস্তুত রাখা পুষ্টি সুরক্ষার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকল্প পরিচালক ডা. মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, পুষ্টি কেবল খাদ্য গ্রহণের বিষয় নয়; এটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা, সেবার গুণগত মান এবং একটি সম্প্রদায়ের সামগ্রিক সহনশীলতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
তিনি স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেবার সমন্বিত প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জলবায়ু-সংবেদনশীল পরিকল্পনা ও বহুখাতভিত্তিক সহযোগিতার ওপর জোর দেন।
সমাপনী বক্তব্যে ডা. মোহাম্মদ ইউনুস আলী বলেন, পুষ্টি একটি সুস্থ, শিক্ষিত ও উৎপাদনশীল জাতি গঠনের অন্যতম ভিত্তি। বাংলাদেশ এ খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও জলবায়ু পরিবর্তন, দুর্যোগ এবং সামাজিক বৈষম্যের কারণে অপুষ্টি এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি জীবনের প্রথম এক হাজার দিন কিশোর-কিশোরীদের পুষ্টি, খাদ্য বৈচিত্র্য, শক্তিশালী তথ্যব্যবস্থা এবং অংশীদারিত্বভিত্তিক উদ্যোগকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।
কর্মশালার শেষে অংশগ্রহণকারীরা জাতিসংঘ ঘোষিত পুষ্টি বিষয়ক কর্মদশক ‘ইউএন ডিকেড অব অ্যাকশন অন নিউট্রিশন’ এবং বৈশ্বিক পুষ্টি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে একটি সুস্থ, সহনশীল ও পুষ্টি-নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সম্মিলিত ও সমন্বিত উদ্যোগ জোরদারের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।