ভেদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রায় এক মাস ধরে বন্ধ রয়েছে সিজারিয়ান অপারেশন। যার কারণে বিপাকে পড়েছেন উপজেলার প্রসূতি মায়েরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, সিজার সেবা বন্ধ থাকায় হাসপাতালে প্রসূতি রোগীর সংখ্যা কমে গেছে। অনেক রোগী ভর্তি হওয়ার আগেই জানতে চাইছেন জরুরি প্রয়োজনে সিজারের ব্যবস্থা আছে কি না। ব্যবস্থা না থাকায় তারা বেসরকারি ক্লিনিকে চলে যাচ্ছেন। অনেকে যাচ্ছেন অন্য উপজেলায়। এতে চরম দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে প্রসূতি ও তার পরিবারের সদস্যদের।
উপজেলার মহিষার গ্রামের সালমা বেগম গত ১০ জুন একটি বেসরকারি ক্লিনিকে সিজারের মাধ্যমে ছেলে সন্তানের জন্ম দেন। তার স্বামী রাকিব মিয়া একজন ভ্যানচালক। সংসারের সীমিত আয়ে কোনোমতে চললেও স্ত্রীর অস্ত্রোপচারের খরচ জোগাতে তাকে চরম সংকটে পড়তে হয়েছে।
রাকিবের বোন সাথী আক্তার বলেন, ‘চিকিৎসকরা আগেই বলেছিলেন সিজার লাগবে। উপজেলা হাসপাতালে নিয়ে গেলে জানতে পারি অ্যানেসথেসিয়া ডাক্তার নেই। বাধ্য হয়ে বেসরকারি ক্লিনিকে যেতে হয়েছে। সেখানে সিজার করতে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। টাকা জোগাড় করতে আমার ভাইয়ের ভ্যান পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছে। আমরা গরিব মানুষ, সরকারি হাসপাতালে এই সেবা থাকলে এত কষ্ট হতো না।’
হাসপাতালে ভর্তি হওয়া প্রসূতি আছিয়া বেগম বলেন, ‘আল্লাহর রহমতে আমার স্বাভাবিক প্রসব হয়েছে। তবে শেষ মুহূর্তে যদি সিজারের প্রয়োজন হতো, তাহলে কী করতাম সেই দুশ্চিন্তায় ছিলাম। সরকারি হাসপাতালে এই সেবা চালু থাকলে আমাদের মতো স্বল্প আয়ের মানুষ অনেক উপকৃত হতো।’
রোগীর স্বজন কুলসুমা বেগম বলেন, ‘আমার আগের সন্তানও এই হাসপাতালে হয়েছে। এবার এসে শুনলাম সিজারের ব্যবস্থা নেই। ডেলিভারির সময় জটিলতা হলে কোথায় যাব, সেই চিন্তায় ছিলাম। ক্লিনিকে সিজার করাতে অনেক টাকা লাগে, গরিব মানুষের পক্ষে তা বহন করা খুবই কঠিন।’
স্থানীয় বাসিন্দা জলিল হাওলাদার বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালে দ্রুত অপারেশন থিয়েটারের কার্যক্রম চালু করা জরুরি। সিজার সেবা বন্ধ থাকায় শুধু মানুষের অতিরিক্ত টাকা খরচ হচ্ছে না, অনেক সময় প্রসূতি মা ও নবজাতকের জীবনও ঝুঁকিতে পড়ছে।’
হাসপাতালের সেবিকা সাদিয়া খাতুন ও রহিমা বেগম বলেন, সিজারিয়ান কার্যক্রম চালু থাকাকালে হাসপাতালে প্রসূতি রোগীর চাপ অনেক বেশি ছিল। বর্তমানে রোগীরা ভর্তি হওয়ার আগে সিজারের ব্যবস্থা আছে কি না জানতে চান। ব্যবস্থা না থাকায় অনেকেই বেসরকারি ক্লিনিকে চলে যাচ্ছেন। অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসকের পদ পূরণ হলে আবার আগের মতো পূর্ণাঙ্গ প্রসূতি সেবা চালু করা সম্ভব হবে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ১৯৭২ সালে ৩১ শয্যাবিশিষ্ট হিসেবে হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর ২০১১ সালে ৫০ শয্যায় উন্নীত হয়। বর্তমানে উপজেলার ১২টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার মোট তিন লাখের বেশি মানুষ এই হাসপাতালে সেবা নেন।
প্রতিদিন জরুরি বিভাগ ও বহির্বিভাগ মিলিয়ে ৭০০ থেকে ৮০০ রোগী এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। প্রতি মাসে গড়ে ২০ থেকে ২৫টি সিজারিয়ান অপারেশন এবং বছরে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ জন প্রসূতি এই সেবা গ্রহণ করতেন। কিন্তু গত এক মাস ধরে হাসপাতালে অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসক না থাকায় অন্তত ২৫ জন প্রসূতি সিজারিয়ান সেবা না পেয়ে অন্যত্র চিকিৎসা নিতে বাধ্য হয়েছেন।
এ বিষয়ে ভেদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ইফতেখারুল ইসলাম বলেন, ‘মাদারীপুরে নতুন করে আইসিইউ সেবা চালু হওয়ায় আমাদের হাসপাতালের অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসককে সেখানে বদলি করা হয়েছে। নতুন চিকিৎসক পদায়নের জন্য বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আশা করছি দ্রুতই একজন অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসক পদায়ন করা হবে।’