শীর্ষ কর্তাদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ
‘দিনের পর দিন আমরা রক্ত পানি করে খাটুনি খেটেছি। আর আজ চাকরি হারানোর ৩ থেকে ৫ বছর পরও ন্যায্য প্রভিডেন্ট ফান্ড আর গ্র্যাচুইটির টাকা হাতপেতে চাইতে হচ্ছে! আমরা কি ভিক্ষা চাচ্ছি? এটা অধিকার!’ ক্ষোভে, দুঃখে ও তীব্র অপমানে গলা কাঁপছিল নাভানা ইলেকট্রনিক্সের সাবেক সিনিয়র এক কর্মকর্তার। শুধু তিনি একাই নন, তার মতো এমন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন ভুক্তভোগী সোমবার সকাল ১০টায় রাজধানীর তেজগাঁও লিংক রোডে ‘নাভানা টয়োটা থ্রি এস সেন্টার’-এর সামনে জড়ো হয়েছিলেন। দীর্ঘদিনের নীরবতা ভেঙে ব্যানার-প্ল্যাকার্ড হাতে রাজপথে নেমে এসেছেন নাভানা গ্রুপের বিভিন্ন অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের সাবেক কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।
মানববন্ধনে আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, বিগত ৩ থেকে ৬ বছর আগে নাভানা কনস্ট্রাকশন ও নাভানা ইলেকট্রনিক্সসহ বেশ কয়েকটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান থেকে বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত বা অব্যাহতি দেওয়া হয়। কিন্তু রহস্যজনকভাবে আটকে দেওয়া হয় তাদের আইনসম্মত প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটিসহ যাবতীয় ফাইনাল সেটেলমেন্ট।
ভুক্তভোগীরা আরও জানান, এতদিন তারা ভয়ে মুখ খুলতে পারেননি। বিগত বছরগুলোতে কেউ শ্রম আদালতে অভিযোগ করতে গেলে কিংবা নিজের পাওনা টাকা দাবি করলেই নাভানা কর্তৃপক্ষ থেকে আসতো নানা হুমকি। মিথ্যা মামলা ও নানামুখী হয়রানি দিয়ে মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য করা হতো কর্মচারীদের। তবে সাম্প্রতিক সময়ে নাভানা গ্রুপের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে আইনি ব্যবস্থা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটায়, সাধারণ কর্মচারীরা এখন সাহস করে রাজপথে নামার শক্তি পেয়েছেন।
মানববন্ধনে বিক্ষুব্ধ সাবেক কর্মচারীরা অভিযোগ তুলেছেন, প্রতিষ্ঠানের সাধারণ কর্মীদের দেনা-পাওনা পরিশোধ না করে মানবেতর জীবনে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে মালিকপক্ষ ও শীর্ষ ম্যানেজমেন্টের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা বিদেশে পাচার করা টাকায় বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, নাভানার এসভিসি সাইফুল ইসলাম সুমন এবং ভিসি সাজেদুল ইসলাম শুভ্র দেশের বিভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন। পরবর্তী সময়ে সেই বিপুল অর্থ হুন্ডি এবং মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হয়েছে!
এই বিশাল অর্থ পাচার ও জালিয়াতির প্রক্রিয়ায় নাভানার ভেতরের শক্তিশালী সিন্ডিকেট সহযোগিতা করেছে বলে মানববন্ধনে দাবি করা হয়। অভিযোগের আঙুল উঠেছে, হেড অব ট্রেজারি মোস্তফা জাহিদ, ফাইন্যান্স অ্যান্ড অ্যাকাউন্টসের জিএম শাহাদাত ও জাকারিয়া, কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্সের জিএম পাভেল ও আরিফের বিরুদ্ধে। পাশাপাশি, নাভানার মানবসম্পদ বিভাগের জিএম ফারজানা ইয়াসমিনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কর্মচারীরা। এ বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
শ্রমজীবী মানুষগুলো সরকারের সংশ্লিষ্ট শ্রম অধিদপ্তর, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং জাতীয় মানবাধিকার সংস্থার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। মিডিয়া রিপোর্টের সূত্রে তাদের মূল দাবি তিনটি—অবিলম্বে চূড়ান্ত পাওনা পরিশোধ, নাভানা ইলেকট্রনিক্স ও অন্যান্য সহযোগী প্রতিষ্ঠানের চাকরিচ্যুত বা অব্যাহতিপ্রাপ্ত সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পূর্ণ ফাইনাল সেটেলমেন্ট অবিলম্বে বুঝিয়ে দিতে হবে। অতীতে পাওনা চাওয়ার অপরাধে কর্মচারীদের বিরুদ্ধে যেসকল হয়রানিমূলক ব্যবস্থা বা মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে, তা দ্রুত প্রত্যাহার করতে হবে। ব্যাংকের ঋণ ফাঁকি দিয়ে এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বঞ্চিত করে যে হাজার হাজার কোটি টাকা দেশের বাইরে পাচার করা হয়েছে, তার সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে।
ভুক্তভোগীদের হুঁশিয়ারি—দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের জীবনের শেষ সম্বলটুকু ফিরিয়ে দেওয়া না হলে, আগামীতে আরও কঠোর ও তীব্র কর্মসূচির দিকে যাবেন তারা।