ফিলিস্তিনের অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমে অবস্থিত আল-আকসা মসজিদকে ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে মুসলিমবিশ্বে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইসরায়েলি কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলোর ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি, মসজিদ প্রাঙ্গণে তাদের প্রবেশের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং সেখানে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের দাবি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, গাজায় চলমান যুদ্ধের আড়ালে আল-আকসাকে কেন্দ্র করে এমন পরিবর্তন ঘটছে, যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পুরো অঞ্চলের ওপর পড়তে পারে।
প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আল-আকসা এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে শুধু ফিলিস্তিনিদের নয়, গোটা মুসলিমবিশ্বের প্রতিক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কয়েক দশক ধরে যে ধর্মীয় ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা আল-আকসাকে ঘিরে বজায় ছিল, তা ধীরে ধীরে পরিবর্তনের মুখে পড়ছে। এই পরিবর্তন যদি স্থায়ী রূপ পায়, তাহলে ভবিষ্যতে জেরুজালেমের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বাস্তবতাও বদলে যেতে পারে।
আল-আকসা মুসলমানদের কাছে ইসলাম ধর্মের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান। ইসলামী ঐতিহ্য অনুযায়ী, এখান থেকেই মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মিরাজ সংঘটিত হয়েছিল। বহু শতাব্দী ধরে এটি মুসলিমবিশ্বের ধর্মীয় পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। একই সঙ্গে জেরুজালেম ইহুদি ও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের কাছেও পবিত্র শহর। ফলে এই স্থানকে ঘিরে যেকোনো পরিবর্তন আন্তর্জাতিক গুরুত্ব বহন করে।
বর্তমানে আল-আকসা মসজিদ কমপ্লেক্সের প্রশাসনিক দায়িত্ব জর্ডানের ইসলামি ওয়াকফ কর্তৃপক্ষের হাতে থাকলেও নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ ইসরায়েলের হাতে। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর থেকে এই ব্যবস্থাই কার্যকর রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে একটি অলিখিত সমঝোতা ছিল যে অমুসলিমরা সেখানে প্রবেশ করতে পারবে, কিন্তু ধর্মীয় উপাসনা করবে না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই সমঝোতা নিয়ে বিতর্ক বেড়েছে।
ফিলিস্তিনি ও জর্ডানের কর্মকর্তারা অভিযোগ করছেন, ইসরায়েলি কট্টরপন্থী রাজনীতিক ও বসতি স্থাপনকারী গোষ্ঠীগুলো ক্রমশ বেশি সংখ্যায় মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রবেশ করছে। অনেক ক্ষেত্রে সেখানে প্রকাশ্যে ধর্মীয় আচার পালনের ঘটনা ঘটেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তাদের দাবি, এটি বিদ্যমান ব্যবস্থাকে পরিবর্তনের প্রচেষ্টা।
অন্যদিকে ইসরায়েলি সরকার বলছে, তারা ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করছে এবং বর্তমান ব্যবস্থায় আনুষ্ঠানিক কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। তবে ইসরায়েলের ভেতরেই কিছু কট্টরপন্থী রাজনৈতিক শক্তি প্রকাশ্যে আল-আকসার প্রশাসনিক কাঠামো পরিবর্তনের পক্ষে কথা বলছে। তাদের কেউ কেউ সেখানে ইহুদি উপাসনার অধিকারের দাবি করছে।
গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে আল-আকসাকে ঘিরে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। ফিলিস্তিনিরা অভিযোগ করছেন, পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে চলাচলের ওপর কঠোর বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে। অনেক মুসল্লি নিয়মিতভাবে মসজিদে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছেন না। বিশেষ করে জুমা ও ঈদের নামাজের সময় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে অসন্তোষ বেড়েছে।
আন্তর্জাতিক মহলেও এ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন কর্মকর্তা বারবার সতর্ক করেছেন, জেরুজালেমের পবিত্র স্থানগুলোর বর্তমান অবস্থা পরিবর্তনের যেকোনো প্রচেষ্টা বৃহত্তর সংঘাতের জন্ম দিতে পারে। একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ওআইসি তথা ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা ও জর্ডান সরকার।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আল-আকসা শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়; এটি ফিলিস্তিনি জাতীয় পরিচয়, জেরুজালেমের ভবিষ্যৎ ও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ভারসাম্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অতীতেও দেখা গেছে, আল-আকসাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা দ্রুত বৃহত্তর সংঘাতে রূপ নিতে পারে। ২০০০ সালে আল-আকসা প্রাঙ্গণে বিতর্কিত সফরের পর যে গণঅভ্যুত্থান শুরু হয়েছিল, তা কয়েক বছর ধরে রক্তক্ষয়ী সংঘাতে পরিণত হয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছেন, গাজায় যুদ্ধ, পশ্চিম তীরে উত্তেজনা ও জেরুজালেমে ধর্মীয় বিরোধ—এই তিনটি সংকট এখন একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে। ফলে আল-আকসা ইস্যু আর শুধু স্থানীয় কোনো বিরোধ নয়; এটি পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।
মিডলইস্ট মনিটরের বিশ্লেষণে মূল প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, আল-আকসাকে ঘিরে যে পরিবর্তনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, তার বিরুদ্ধে মুসলিমবিশ্ব কতটা কার্যকর ও ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা নেবে? কারণ বিবৃতি, নিন্দা ও কূটনৈতিক উদ্বেগের বাইরে বাস্তবে খুব কম পদক্ষেপই দেখা যাচ্ছে। সেই কারণেই অনেকের মতে, আল-আকসার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি।
গাজায় যুদ্ধ অব্যাহত থাকা, পশ্চিম তীরে অভিযান বৃদ্ধি ও জেরুজালেমে ধর্মীয় উত্তেজনা বাড়ার প্রেক্ষাপটে আল-আকসা আবারও মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে স্পর্শকাতর ইস্যুগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। আগামী মাসগুলোতে পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, সেটিই এখন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বিশ্ব।
সূত্র: মিডল ইস্ট মনিটর, আল জাজিরা, ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা, জর্ডান ওয়াকফ প্রশাসন সম্পর্কিত সরকারি তথ্যভাণ্ডার