দীর্ঘ প্রায় তিন মাস অনলাইন দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন ইরানের কোটি কোটি মানুষ। প্রিয়জনদের সঙ্গে অবাধে যোগাযোগ করা, স্বাধীন সংবাদপত্র পড়া, চলচ্চিত্র দেখা বা ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরশীল ব্যবসা পরিচালনা করা—সবকিছুই ছিল একেবারে বন্ধ।
ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ও অধিকারকর্মীরা জানিয়েছেন, আধুনিক ইতিহাসের দীর্ঘতম ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের পর মঙ্গলবার (২৬ মে) থেকে ধীরে ধীরে বিশ্বের সঙ্গে আবারও যুক্ত হতে শুরু করেছে ইরানিরা। এসময় তাদের মধ্যে স্বস্তি, অবিশ্বাস, ক্ষোভ আর উৎকণ্ঠার মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
তেহরানের ২৯ বছর বয়সী তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী হামিদ দীর্ঘ বিরতির পর ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার অনুভূতি সম্পর্কে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ‘আমার মনের ভেতর এখন মিশ্র অনুভূতি কাজ করছে। আমি আনন্দিত, কিন্তু একই সঙ্গে নিজের ওপর নিজেরই রাগ হচ্ছে যে, ইন্টারনেটের মতো এত সাধারণ একটা জিনিস ফিরে পেয়ে আমাকে খুশি হতে হচ্ছে!’
এই ইরানি তরুণ বলেন, ‘ব্যক্তিগত যোগাযোগ এবং চাকরি উভয় ক্ষেত্রেই আমি ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরশীল। এই তিন মাস আমার জীবন আর কাজ একদম স্থবির হয়ে পড়েছিল।’
এ বছরের জানুয়ারিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ কঠোরভাবে দমনের সময় ইন্টারনেট শাটডাউন করে ইরান সরকার। সেই ধকল কাটিয়ে ইরানিরা বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে পুরোপুরি যুক্ত হওয়ার এক মাসের মাথায় মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলা শুরু হয় এবং আবারও ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। টানা ৮৮ দিন সম্পূর্ণ অন্ধকারে ছিলেন ইরানের প্রায় ৯ কোটি মানুষ।
এই সময়ে সাধারণ মানুষ কেবল সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণে থাকা অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে রাষ্ট্র-অনুমোদিত কিছু অ্যাপ ও ওয়েবসাইট ব্যবহার করতে পারতেন। অন্যদিকে স্বাধীন সংবাদমাধ্যম, বিদেশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং মেসেজিং অ্যাপগুলো সম্পূর্ণ বন্ধ করে রাখা হয়েছিল।
তেহরানের একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থার ৩৯ বছর বয়সী কর্মী মরিয়ম দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ‘সবচেয়ে কষ্টের বিষয় ছিল এমন সব সংবাদ পড়া, যা আপনি নিজে বিশ্বাস করেন না, অথচ সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা সেই বয়ানই আপনাকে গিলতে হচ্ছে। আমরা সম্পূর্ণ একটা তথ্যহীন অন্ধকার গর্তের মধ্যে ছিলাম।’
মরিয়ম জানান, মাসের পর মাস ধরে শুধু বিশ্ব পরিস্থিতিই নয়, শহরের বাইরে থাকা বন্ধু ও আত্মীয়স্বজনদের খবরও ঠিকমতো নিতে পারেননি তিনি।
নিজের মানসিক অবস্থা প্রকাশ করে মরিয়ম বলেন, ‘আমার মনে হচ্ছে, আমি মাত্র জেল থেকে মুক্তি পেলাম। আমি এখনো ধাক্কাটা সামলে উঠতে পারছি না। আমার আসলে কিছু বলার ভাষা নেই। আমি শুধু বাইরের পৃথিবীর শব্দ শোনার চেষ্টা করছি।’