মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে আব্রাহাম অ্যাকর্ড বা আব্রাহাম চুক্তি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবার ক্ষমতায় ফেরার পর এই চুক্তিকে নতুন করে সক্রিয় করার চেষ্টা শুরু করেছেন। বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা ও পারমাণবিক আলোচনা ঘিরে তার কৌশলের ভেতরে এই চুক্তির বিষয়টি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যমগুলো তাদের এক বিশ্লেষণে বলেছে, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সঙ্গে আলোচনাকে শুধু পারমাণবিক সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চাচ্ছে না। বরং তারা এই আলোচনাকে ব্যবহার করে আরবদেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক আরও গভীর করতে চাইছে। আর এই পুরো পরিকল্পনার কেন্দ্রে রয়েছে আব্রাহাম চুক্তি।
এই চুক্তির শুরু ২০২০ সালে। তখন ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যস্থতায় সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন প্রথমবারের মতো ইসরায়েলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক স্থাপন করে। পরে মরক্কো ও সুদানও সেই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়। কয়েক দশক ধরে আরববিশ্বের বড় অংশ ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে এসেছিল। ফিলিস্তিন প্রশ্নের সমাধান ছাড়া সম্পর্ক স্বাভাবিক করা হবে না—এমন অবস্থানই ছিল তাদের। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন সেই পুরনো সমীকরণ বদলে দেয়।
এই চুক্তির নাম রাখা হয় আব্রাহাম, কারণ ইহুদি, মুসলিম ও খ্রিস্টান—তিন ধর্মেই হযরত ইব্রাহিমকে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে মানা হয়। যুক্তরাষ্ট্র তখন এটিকে ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি বলে প্রচার করে। কিন্তু সমালোচকেরা বলেন, এটি আসলে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানবিরোধী একটি নতুন জোট তৈরির অংশ ছিল।
ট্রাম্প কেন এই চুক্তি নিয়ে এত উৎসাহী, তার পেছনে কয়েকটি বড় কারণ আছে। প্রথমত, তিনি এটিকে নিজের সবচেয়ে বড় পররাষ্ট্রনীতি সাফল্য হিসেবে তুলে ধরতে চান। তার রাজনৈতিক প্রচারণাতেও বারবার বলা হয়, আগের মার্কিন প্রশাসন যেখানে যুদ্ধ থামাতে পারেনি, সেখানে ট্রাম্প আরবদেশ ও ইসরায়েলকে এক টেবিলে বসিয়েছিলেন।
দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ইয়েমেন, লেবানন, সিরিয়া ও ইরাকে তাদের প্রভাব বাড়ানো—এসব বিষয় নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগ বহু পুরোনো। ট্রাম্প মনে করেন, যদি আরবদেশগুলোকে ইসরায়েলের সঙ্গে একই কূটনৈতিক ছাতার নিচে আনা যায়, তাহলে ইরানকে আরও চাপের মধ্যে রাখা সহজ হবে।
এই কারণেই এখন সৌদি আরবকে এই চুক্তিতে আনার চেষ্টা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে সৌদি আরবের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরব যদি আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে, তাহলে পুরো অঞ্চলের রাজনৈতিক ভারসাম্য বদলে যেতে পারে।
তবে বিষয়টি এত সহজ নয়। গাজায় চলমান যুদ্ধ পুরো পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। ফিলিস্তিনে ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞের কারণে আরববিশ্বের সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বেড়েছে। ফলে অনেক আরব সরকার এখন প্রকাশ্যে ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে অস্বস্তিতে আছে। বিশেষ করে সৌদি আরব বারবার বলছে, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সুস্পষ্ট অগ্রগতি ছাড়া সম্পর্ক স্বাভাবিক করা কঠিন।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ট্রাম্প এখন ইরানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে একদিকে উত্তেজনা কমাতে চাইছেন, অন্যদিকে আরব দেশগুলোকে বোঝাতে চাইছেন যে যুক্তরাষ্ট্র এখনো মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা শক্তি। এই কৌশলের ভেতরেই আব্রাহাম চুক্তিকে আবার সামনে আনা হচ্ছে।
তবে ইরান পুরো বিষয়টিকে সন্দেহের চোখে দেখছে। তেহরানের ধারণা, এই চুক্তির মূল লক্ষ্যই হলো ইরানকে কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করা। ইরানি নেতারা আগেও বলেছিলেন, এটি কোনো শান্তিচুক্তি নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন বিভাজন তৈরি করার চেষ্টা।
অন্যদিকে ইসরায়েল এই চুক্তিকে নিজেদের জন্য বড় কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে দেখে। কারণ বহু বছর ধরে আরববিশ্বে একঘরে থাকা দেশটি এখন ধীরে ধীরে সম্পর্ক বাড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে। বাণিজ্য, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা সহযোগিতা—সব ক্ষেত্রেই নতুন দরজা খুলেছে।
বিশ্ব রাজনীতির পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, ট্রাম্পের পুরো পরিকল্পনার পেছনে একটি বড় রাজনৈতিক হিসাবও আছে। তিনি মধ্যপ্রাচ্যে নিজেকে শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী নেতা হিসেবে তুলে ধরতে চান। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ইসরায়েলপন্থী ভোটারদের সমর্থনও ধরে রাখতে চাইছেন।
তবে সমালোচকেরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ফিলিস্তিন প্রশ্নের স্থায়ী সমাধান ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি সম্ভব নয়। কারণ আব্রাহাম চুক্তি আরব সরকারগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করলেও সাধারণ মানুষের ক্ষোভ কমাতে পারেনি। বরং গাজা যুদ্ধের পর সেই ক্ষোভ আরও বেড়েছে।
এই মুহূর্তে তাই মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতি এক জটিল মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে ইরানকে ঘিরে নতুন সমীকরণ তৈরির চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে গাজার যুদ্ধ পুরো অঞ্চলকে অস্থির করে তুলেছে। এর মাঝখানে ট্রাম্প আবারও আব্রাহাম চুক্তিকে সামনে এনে নতুন এক আঞ্চলিক জোট গড়ার স্বপ্ন দেখছেন।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই পরিকল্পনা সফল হবে কিনা, সেটি এখনো অনিশ্চিত। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, এই অঞ্চলের রাজনীতি কখনোই সরল পথে চলে না। এখানে আজকের মিত্র কাল প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে যায়, আবার পুরোনো শত্রুও হঠাৎ আলোচনার টেবিলে বসে পড়ে।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই, রয়টার্স, আল জাজিরা, বিবিসি, নিউ ইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ