ইরানকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আবারও কঠোর বার্তায় স্পষ্ট করলেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তিনি বলেছেন, ‘তেহরানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান চায় ওয়াশিংটন। তবে সেই আলোচনা ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্র ভিন্ন পথ বেছে নেবে।’ তার এই মন্তব্য ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হল। কারণ কয়েক মাস ধরে চলা উত্তেজনা, সামরিক হামলা ও জ্বালানি সংকটের পর বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে সম্ভাব্য ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার দিকে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে আলোচনার সবচেয়ে বড় বিষয় হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়েই বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল পরিবহন হয়। যুদ্ধের কারণে দীর্ঘ সময় ধরে সেখানে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় এবং এশিয়া ও ইউরোপের অনেক দেশ জ্বালানি সংকটে পড়ে। এখন সম্ভাব্য সমঝোতার খবরে বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে।
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে সফরকালে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন রুবিও। তিনি জানান, ইরানের সঙ্গে একটি ‘ভালো ও শক্ত’ সমঝোতার চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কোনো ‘খারাপ চুক্তি’ করবেন না বলেও তিনি স্পষ্ট করে দেন। রুবিওর ভাষায়, ‘কূটনীতিক সব পথ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ওয়াশিংটন আলোচনার দরজা খোলা রাখবে। কিন্তু আলোচনা ভেঙে পড়লে পরিস্থিতি অন্যদিকে যেতে পারে।’
বর্তমানে আলোচনায় যে বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে, তার মধ্যে রয়েছে ইরানের ইউরেনিয়াম মজুত, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে ইরান তাদের উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়াম কর্মসূচি সীমিত করুক। অন্যদিকে তেহরান বলছে, নিজেদের পারমাণবিক কার্যক্রম তারা পুরোপুরি বন্ধ করবে না। ইরানের দাবি, আগে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে হবে ও বিদেশে আটকে থাকা অর্থ ছাড় দিতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, আলোচনার অগ্রগতি হলেও দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাস এখনো গভীর। কারণ গত কয়েক মাসে সংঘাত ভয়াবহ আকার নিয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। এরপরই হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা বাড়ে। আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল প্রায় অচল হয়ে পড়ে। পাকিস্তান ও চীনের দিকে মধ্যপ্রাচ্যের তেলবাহী জাহাজ ঘুরিয়ে নেওয়ার ঘটনাও সামনে আসে।
এদিকে ওয়াশিংটনের ভেতরেও ইরান নীতি নিয়ে বিভক্তি তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীল রাজনৈতিক গোষ্ঠীর একাংশ মনে করছে, ইরানের সঙ্গে আপস করা কৌশলগত ভুল হবে। আবার আরেকটি অংশ যুদ্ধ এড়িয়ে কূটনীতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। মার্কো রুবিও এখন সেই চাপের মাঝেই আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরেও বিতর্ক বাড়ছে।
বিশ্ব অর্থনীতিও এখন এই আলোচনার ফলাফলের ওপর অনেকটাই নির্ভর করছে। যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও স্বর্ণের দাম ব্যাপক ওঠানামা করছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সমঝোতার সম্ভাবনা বাড়ায় তেলের দাম কমেছে ও শেয়ারবাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরেছে।
মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক গবেষকরা বলছেন, যদি এই আলোচনা সফল হয়, তাহলে শুধু ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নয়, পুরো অঞ্চলের রাজনৈতিক বাস্তবতাই বদলে যেতে পারে। লেবানন, সিরিয়া ও ইয়েমেনের চলমান সংঘাতেও এর প্রভাব পড়বে। তবে আলোচনায় ব্যর্থতা মানে নতুন সামরিক অভিযান, আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা।
এই পরিস্থিতিতে রুবিওর ‘অন্য পথ’ মন্তব্যকে অনেকেই সরাসরি সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। যদিও যুক্তরাষ্ট্র এখনো প্রকাশ্যে যুদ্ধের কথা বলছে না। তবু কূটনীতিক আলোচনার আড়ালে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়ছে বলেও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
বিশ্ব এখন অপেক্ষা করছে, তেহরান ও ওয়াশিংটন শেষ পর্যন্ত সমঝোতার পথে হাঁটবে, নাকি আবারও যুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠবে।
সূত্র: রয়টার্স, আল জাজিরা, ওয়াশিংটন পোস্ট, দ্য গার্ডিয়ান।