যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিখাতে আবারও বড় ধরনের চাকরি ছাঁটাই শুরু হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম জায়ান্ট মেটা একসঙ্গে প্রায় আট হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছে। এর আগে ওরাকলসহ আরও কয়েকটি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হাজার হাজার কর্মীকে বাদ দেয়। সবচেয়ে বেশি আতঙ্কে আছেন বিদেশি কর্মীরা, বিশেষ করে ভারতীয় প্রযুক্তি পেশাজীবীরা। কারণ তাদের অনেকেই কাজ করছেন বিশেষ কর্মভিসায়। চাকরি হারালে শুধু আয় নয়, যুক্তরাষ্ট্রে থাকার অধিকারও ঝুঁকিতে পড়ে যাচ্ছে তাদের।
মেটার প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্তকে খুব কঠিন বলে উল্লেখ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, কোম্পানিকে আরও কার্যকর ও ভবিষ্যতমুখী করতে এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। তবে কর্মীদের বড় অংশ মনে করছেন, এর পেছনে আসল কারণ হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তিতে বিপুল বিনিয়োগ।
গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিখাত দ্রুত বদলে গেছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এখন মানুষের বদলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর ব্যবস্থা বাড়াচ্ছে। ফলে আগের অনেক কাজের প্রয়োজন কমে যাচ্ছে। প্রযুক্তি বিশ্লেষকেরা বলছেন, তথ্য বিশ্লেষণ, গ্রাহকসেবা, সফটওয়্যার পরীক্ষা ও কনটেন্ট ব্যবস্থাপনার মতো বহু খাতে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু হওয়ায় কর্মীসংখ্যা কমানো হচ্ছে।
মেটা আগেই জানিয়েছিল, তারা কর্মদক্ষতা বাড়ানোর নামে প্রায় ১০ শতাংশ কর্মী কমাবে। একই সঙ্গে নতুন নিয়োগও সীমিত করা হয়েছে। কয়েক হাজার শূন্য পদ বাতিল করা হয়েছে বলেও জানা গেছে। যদিও প্রতিষ্ঠানটি দাবি করছে, কিছু কর্মীকে নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিভাগে স্থানান্তর করা হবে।
সবচেয়ে বড় সংকটে পড়েছেন বিশেষ কর্মভিসায় থাকা বিদেশিরা। যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত বহু ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী এই ভিসার ওপর নির্ভরশীল। নিয়ম অনুযায়ী, চাকরি হারানোর পর নতুন নিয়োগকর্তা খুঁজে পাওয়ার জন্য সাধারণত মাত্র ৬০ দিন সময় পান তারা। এই সময়ের মধ্যে নতুন প্রতিষ্ঠানে চাকরি না পেলে দেশ ছাড়তে হতে পারে।
এখন সেই ভয় আরও বাস্তব হয়ে উঠেছে। কারণ প্রযুক্তিখাতজুড়ে নিয়োগ কমে গেছে। সিলিকন ভ্যালির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চলতি বছরেই এক লাখের বেশি কর্মী চাকরি হারিয়েছেন বলে একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জানিয়েছে। তাদের মধ্যে ভারতীয়দের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।
অনেকের জীবন এখন অনিশ্চয়তায় ঝুলছে। কেউ বহু বছর ধরে স্থায়ী বসবাসের অনুমতির অপেক্ষায় আছেন। কারও সন্তান যুক্তরাষ্ট্রে জন্মেছে। কেউ বাড়ি কিনেছেন, ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখেছেন। চাকরি হারানোর পর এখন সব পরিকল্পনাই হুমকির মুখে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যা শুধু চাকরি হারানো নয়; পুরো অভিবাসন ব্যবস্থাই এখন আরও কঠোর হয়ে উঠছে। সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন নতুন নীতি ঘোষণা করেছে, যেখানে স্থায়ী বসবাসের অনুমতির জন্য অনেক আবেদনকারীকে নিজ দেশে ফিরে গিয়ে আবেদন করতে বলা হচ্ছে। এতে বিদেশি কর্মীদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
চাকরি হারানো অনেক ভারতীয় কর্মী এখন অস্থায়ীভাবে অন্য ধরনের ভিসায় যাওয়ার পথ খুঁজছেন, যাতে কিছুটা সময় পাওয়া যায় নতুন কাজ খোঁজার জন্য। কেউ কেউ কানাডা বা ইউরোপে যাওয়ার কথাও ভাবছেন। আবার সাম্প্রতিক কিছু জরিপ বলছে, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভারতীয় পেশাজীবী দেশে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনাও করছেন।
প্রযুক্তিখাতের এই সংকট নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও বিতর্ক বাড়ছে। সমালোচকেরা বলছেন, বড় প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল মুনাফা করেও খরচ কমানোর নামে হাজার হাজার মানুষের জীবন অনিশ্চিত করে দিচ্ছে। অন্যদিকে কোম্পানিগুলোর দাবি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে টিকে থাকতে ব্যবসায়িক কাঠামো বদলানো ছাড়া উপায় নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু সাময়িক ছাঁটাই নয়; বরং প্রযুক্তি শিল্পে বড় পরিবর্তনের শুরু। আগামী কয়েক বছরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার আরও বাড়লে বহু প্রচলিত চাকরি হারিয়ে যেতে পারে। আর সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে বিদেশি কর্মীদের ওপর, যাদের ভবিষ্যৎ এখন ভিসা, চাকরি আর অনিশ্চয়তার এক জটিল সমীকরণে আটকে গেছে।
সূত্র: আনন্দবাজার, রয়টার্স, সিবিএস নিউজ, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ও অভিবাসন সংস্থা, প্রযুক্তি বিশ্লেষণভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন