মাত্র তিন মাস আগেও ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থকরা মনে করছিলেন, ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে তিনি দ্রুত বড় ধরনের রাজনৈতিক জয় পাবেন। কিন্তু সময় যত যাচ্ছে, ততই প্রশ্ন উঠছে, এই যুদ্ধ কি উল্টো ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে?
রয়টার্সের এক বিশ্লেষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের ওপর ধারাবাহিক সামরিক চাপ, উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এখন ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য নতুন সংকট তৈরি করছে। শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসন ধারণা করেছিল, শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে খুব দ্রুত ইরানকে কোণঠাসা করা যাবে। কিন্তু বাস্তবে ইরান পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। বরং দেশটি ধীরে ধীরে নিজেদের সামরিক ও কৌশলগত অবস্থান পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, তিনি যুদ্ধকে দ্রুত ও সীমিত এক অভিযান হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু এখন পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের দিকে যাচ্ছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে। কারণ যুদ্ধ দীর্ঘ হলে নিজ দেশের ওপর অর্থনৈতিক চাপও বাড়ে। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম অস্থির হয়ে উঠেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও এ নিয়ে বিভাজন বাড়ছে। ট্রাম্পের দল রিপাবলিকানদের একাংশ এখনো কঠোর সামরিক অবস্থানের পক্ষে থাকলেও, অন্য অংশ মনে করছে এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রকে আরেকটি দীর্ঘ মধ্যপ্রাচ্য সংকটে টেনে নিচ্ছে। সাবেক গোয়েন্দা প্রধান তুলসি গ্যাবার্ডের পদত্যাগের পর সেই বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, ইরান যুদ্ধ নিয়েই প্রশাসনের ভেতরে বড় ধরনের মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল।
ইরানও কৌশল বদলেছে। সরাসরি বড় আকারের যুদ্ধে না গিয়ে তারা আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে চাপ তৈরি করছে বলে পশ্চিমা বিশ্লেষকদের ধারণা। লোহিত সাগর, ইরাক, সিরিয়া ও লেবাননের বিভিন্ন অঞ্চলে উত্তেজনা এখনো পুরোপুরি কমেনি। ফলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে থাকলেও রাজনৈতিকভাবে দ্রুত সমাধান পাচ্ছে না।
এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিও চাপের মুখে পড়ছে। যুদ্ধের ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি বৈদেশিক সহায়তা কমানো, সামরিক বাজেট বৃদ্ধি ও জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা নিয়ে সমালোচনা বাড়ছে। ট্রাম্পের সমালোচকেরা বলছেন, তিনি যুদ্ধকে রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা বাড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু এখন সেটিই তার জন্য বুমেরাং হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
তবে ট্রাম্প এখনো প্রকাশ্যে আত্মবিশ্বাসী। তিনি দাবি করছেন, ইরানের সামরিক সক্ষমতা মেরুদণ্ডহীন হয়ে গেছে ও যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আছে। কিন্তু মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার কিছু মূল্যায়নে ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। সেখানে বলা হচ্ছে, ইরান ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পুরোপুরি দুর্বল হয়নি এবং তারা দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের জন্য নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, তিনি কীভাবে এই যুদ্ধকে জয় হিসেবে জনগণের সামনে তুলে ধরবেন। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ যুদ্ধ প্রায়ই রাজনৈতিক নেতাদের জনপ্রিয়তা কমিয়ে দিয়েছে। আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধের উদাহরণ এখন আবারও আলোচনায় আসছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধের শুরুতে সামরিক শক্তি দেখানো সহজ হলেও রাজনৈতিক সমাধান তৈরি করাই সবচেয়ে কঠিন। আর সেখানেই এখন ট্রাম্প প্রশাসন চাপের মুখে পড়েছে। যদি সংঘাত আরও দীর্ঘ হয়, তাহলে এটি শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছে। কেউ বলছেন, ট্রাম্প ঠিক মতোই তার কঠোরতা দেখাচ্ছেন। আবার অন্যদের মতে, তিনি এমন এক সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছেন যার শেষ কোথায়, তা ট্রাম্প তো বটেই, এখনো কেউই জানে না।
সূত্র: রয়টার্স, সিএনএন, দ্য গার্ডিয়ান, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস