যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈদেশিক সহায়তা কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন করে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিকবিষয়ক সাময়িকী মডার্ন ডিপ্লোম্যাসিতে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের সহায়তা কাটছাঁটের প্রভাব বিশ্বের অনেক অঞ্চলে এমন মানবিক সংকট তৈরি করছে, যা কিছু যুদ্ধের চেয়েও বেশি প্রাণহানির কারণ হতে পারে। বিশেষ করে আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার দরিদ্র জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য, খাদ্য ও শরণার্থী সহায়তায় অর্থ কমিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন মনে করে, যুক্তরাষ্ট্রের করদাতাদের অর্থ আগে দেশের ভেতরে ব্যয় হওয়া উচিত। ‘আমেরিকা আগে’ নীতির অংশ হিসেবে বিদেশে সহায়তা কমানোকে তারা রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয় সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছে। কিন্তু সমালোচকেরা বলছেন, এই সিদ্ধান্তের কারণে লাখ লাখ মানুষ চিকিৎসা, খাদ্য ও জরুরি মানবিক সহায়তা হারাচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, আফ্রিকার কয়েকটি দেশে টিকা কর্মসূচি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের পুষ্টি, ম্যালেরিয়া প্রতিরোধ ও এইডস চিকিৎসা কর্মসূচিতে অর্থ সংকট দেখা দিয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, আগে যেসব এলাকায় আন্তর্জাতিক সহায়তায় হাসপাতাল, খাদ্য বিতরণ ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা চালু ছিল, সেখানে এখন অনেক প্রকল্প বন্ধ হওয়ার উপক্রম।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধের প্রভাব সাধারণত দৃশ্যমান হয় বোমা, ধ্বংস আর রক্তপাতের মাধ্যমে। কিন্তু বৈদেশিক সহায়তা বন্ধের প্রভাব ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে। শিশুর অপুষ্টি বাড়ে, রোগ ছড়িয়ে পড়ে, চিকিৎসা বন্ধ হয়, খাদ্য সংকট তীব্র হয়। ফলে মৃত্যুর সংখ্যা ধীরে বাড়লেও সেটি দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ হয়ে ওঠে। মডার্ন ডিপ্লোম্যাসির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই নীরব সংকট অনেক সময় সরাসরি যুদ্ধের চেয়েও বেশি প্রাণ কেড়ে নেয়।
গাজা, সুদান ও ইয়েমেনের মতো সংঘাতপূর্ণ এলাকাগুলোতেও এই অর্থ সংকটের প্রভাব পড়ছে। জাতিসংঘের কর্মকর্তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহাসিকভাবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক সহায়তাদাতা দেশগুলোর একটি। ফলে ওয়াশিংটনের সহায়তা কমে গেলে অন্য দেশগুলো সেই ঘাটতি পূরণ করতে পারছে না। এর ফলে লাখ লাখ শরণার্থী ও যুদ্ধপীড়িত মানুষের জীবন আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ মহল অবশ্য এই সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করছে। তাদের দাবি, বহু আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রকল্পে দুর্নীতি, অপচয় এবং রাজনৈতিক পক্ষপাত রয়েছে। তারা বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের অর্থ বিদেশে অকার্যকর প্রকল্পে ব্যয় না করে দেশের অর্থনীতি, সীমান্ত নিরাপত্তা ও সামরিক শক্তিতে বিনিয়োগ করা উচিত। ট্রাম্প নিজেও একাধিকবার বলেছেন, আমেরিকা বিশ্বের এটিএম মেশিন নয়।
তবে আন্তর্জাতিক সহায়তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈদেশিক সহায়তা শুধু মানবিক কাজ নয়; এটি কূটনীতি ও বৈশ্বিক প্রভাব বজায় রাখারও বড় অস্ত্র। যুক্তরাষ্ট্র যখন পিছিয়ে যাচ্ছে, তখন চীন ও রাশিয়া বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশে নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে। বিশেষ করে আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে চীনের বিনিয়োগ ও সহায়তা কার্যক্রম দ্রুত বাড়ছে।
অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করছেন, সহায়তা কমানোর এই নীতি স্বল্পমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অর্থ সাশ্রয় করলেও দীর্ঘমেয়াদে তা নতুন সংকট তৈরি করতে পারে। কারণ দারিদ্র্য, খাদ্য সংকট ও যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা বাড়লে শরণার্থী সংকট, সন্ত্রাসবাদ ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা ঝুঁকিও বাড়ে।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক চলছে। কেউ বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের টাকায় আগে নিজেদের দেশের সমস্যা সমাধান হওয়া উচিত। আবার অন্যদের মতে, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের মানবিক দায়িত্বও রয়েছে। বিশেষ করে যখন লাখ লাখ শিশু খাদ্য ও চিকিৎসার অভাবে ঝুঁকিতে রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই নীতি শুধু অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক ভূমিকা নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে দেশটি নিজেকে আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার প্রধান শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছিল, সেই যুক্তরাষ্ট্র কি এখন ধীরে ধীরে নিজেকে বিশ্ব থেকে গুটিয়ে নিচ্ছে—এই প্রশ্নই এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে।
সূত্র: মডার্ন ডিপ্লোম্যাসি, রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, ফরেন পলিসি, ফক্স নিউজ