পদার্থবিদ্যা ও জ্যামিতির জটিল রহস্য উন্মোচন করে স্টিফেন হকিং হয়ে উঠেছিলেন ব্ল্যাক হোল তত্ত্বের এক বিশ্বখ্যাত পথিকৃৎ। তার লেখা কালজয়ী বই 'এ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম' বিক্রি হয়েছে ১ কোটি ৩০ লাখেরও বেশি কপি।
মানুষকে তিনি শিখিয়েছেন, ‘সবসময় ওপরের তারাদের দিকে তাকাও, নিজের পায়ের দিকে নয়।’
কিন্তু হকিংয়ের ছাত্রজীবনে এবং তিনি যখন প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার কাছাকাছি, তখন তার ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগের মধ্যে ছিলেন তার বাবা ফ্রাঙ্ক হকিং। তিনি এক ডায়েরিতে ছেলেকে নিয়ে এই উদ্বেগের কথা লিখেছিলেন, যার অস্তিত্ব এতদিন সবার অজানা ছিল।
ডায়েরিতে ফ্রাঙ্ক হকিং আক্ষেপ করে লিখেছিলেন, ‘সে (স্টিফেন) ঘরের ভেতর উদ্দেশ্যহীন ঘোরাঘুরি করে। বেশি পড়াশোনা করে না।’
ফ্রাঙ্ক তার ডায়েরির কিছু অংশে বিশেষ এক সংকেত ব্যবহার করেছিলেন।
সম্প্রতি পদার্থবিদ গ্রাহাম ফারমেলো হকিং পরিবারের কিছু ব্যক্তিগত নথিপত্র এবং ছবি দেখার নজিরবিহীন সুযোগ পান, যার মধ্যে এই ডায়েরিও রয়েছে।
শনিবার (২৩ মে) এক প্রতিবেদনে দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, প্রকাশনা সংস্থা জন মারি চলতি সপ্তাহে ঘোষণা করতে যাচ্ছে, আগামী সেপ্টেম্বরে স্টিফেন হকিংয়ের জীবনীর ওপর ভিত্তি করে তার উত্তরাধিকারীদের অনুমোদিত প্রথম পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ প্রকাশ করবেন গ্রাহাম ফারমেলো।
গবেষণার অংশ হিসেবে ফারমেলোকে হকিংয়ের বাবার ডায়েরি থেকে শুরু করে তার মা ইসোবেলের চিঠি ও জার্নালসহ অজানা অনেক নথিপত্র দেখার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এতদিন এই নথিগুলো হকিংয়ের বোন মেরির বাড়িতে সংরক্ষিত ছিল।
ফারমেলো বলেন, ‘এই ডায়েরি ও নথিপত্রগুলো দেখার সুযোগ পাওয়াটা ছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। স্টিফেন হকিংয়ের জীবন, বিশেষ করে তার গড়ে ওঠার দিনগুলো এবং মাত্র ২১ বছর বয়সে যখন তার মোটর নিউরন রোগ ধরা পড়ে, সেই মর্মান্তিক সময়ের তথ্যের জন্য এসব অনেক নির্ভরযোগ্য উৎস।’
এই পদার্থবিদ বলেন, এই নথিপত্রগুলো হকিংয়ের বেড়ে ওঠা এবং ১৯৬৩ সালে তার মারাত্মক ক্ষয়জনিত রোগ ধরা পড়ার দিনগুলোর ‘সহজ, সরল ও অকপট অন্তর্দৃষ্টি’ তুলে ধরে, যে রোগের কারণে পরবর্তী সময়ে তিনি প্রায় সম্পূর্ণ প্যারালাইজড হয়ে পড়েছিলেন।
চিকিৎসকদের ধারণা ছিল, হকিং সর্বোচ্চ দুই বছর বাঁচবেন। কিন্তু সব পূর্বাভাস ভুল প্রমাণ করে মহাবিশ্বতত্ত্ব ও তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যায় যুগান্তকারী কাজ করে এবং স্থান, কাল ও কৃষ্ণগহ্বরের রহস্যের সন্ধান দিয়ে এই সময়ের অন্যতম সেরা প্রতিভায় পরিণত হন তিনি।
২০১৮ সালে ৭৬ বছর বয়সে মৃত্যু হয় স্টিফেনের।
হুইলচেয়ারে বন্দি হওয়ার পর কেবল কম্পিউটার ও ভয়েস সিন্থেসাইজারের মাধ্যমে যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা জয় করে স্টিফেন যে সাফল্য পেয়েছেন, তা মানুষের জন্য ছিল আরও বেশি অনুপ্রেরণার।
তিনি একবার বলেছিলেন, ‘জীবন যদি মজার না হতো, তাহলে তা হতো চরম ট্র্যাজেডি। ২১ বছর বয়সে আমার সব প্রত্যাশা শূন্যে নেমে এসেছিল। এরপর যা কিছু পেয়েছি, সবই বোনাস।’
বিশ্বখ্যাত এই বিজ্ঞানী আরও বলেছিলেন, ‘সবসময় ওপরের তারাদের দিকে তাকাতে মনে রেখো, নিজের পায়ের দিকে নয়। যা দেখছ, তা বোঝার চেষ্টা করো এবং ভাবো, কী এই মহাবিশ্বকে টিকিয়ে রেখেছে। কৌতূহলী হও। জীবন যত কঠিনই মনে হোক না কেন, সবসময় এমন কিছু না কিছু থাকে, যা তুমি করতে পারো এবং সফল হতে পারো। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সহজে হার মেনে না নেওয়া।’