২০২৬ সালের এপ্রিলে এসে বিশ্ব অর্থনীতি এক অদ্ভুত ও ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি। ইউক্রেন যুদ্ধের ধকল কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সাথে শুরু হওয়া সংঘাত কেবল একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ নয়, বরং এটি বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিচ্ছে। আল জাজিরার সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ বলছে, এই যুদ্ধ বিশ্বকে এমন এক এনার্জি শক বা জ্বালানি ধাক্কার দিকে ঠেলে দিয়েছে, যার প্রভাব কয়েক প্রজন্ম ধরে বয়ে বেড়াতে হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের তেলের প্রধান ধমনী বলা হয় হরমুজ প্রণালিকে। যুদ্ধের ডামাডোলে এই পথটি অবরুদ্ধ হওয়ামাত্রই বিশ্ববাজার থেকে উধাও হয়ে গেছে কোটি কোটি ব্যারেল তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাস। কাতার, সৌদি আরব বা কুয়েতের মতো জ্বালানি সমৃদ্ধ দেশগুলো চাইলেও তাদের সরবরাহ সচল রাখতে পারছে না। এই সংকটের গভীরতা এতটাই যে, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা একে গত ৫০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় ‘সাপ্লাই চেইন ডিজরাপশন’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
বাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১২০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়া মানে কেবল পেট্রোল পাম্পে দাম বাড়া নয়; এটি একটি চেইন রিঅ্যাকশন।
পরিবহণ খরচ: পণ্যবাহী জাহাজ ও ট্রাকের খরচ বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গতি শ্লথ হয়ে পড়েছে।
খাদ্য সংকট: সারের উৎপাদন ও কৃষিকাজে জ্বালানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় খাদ্যদ্রব্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই পরিস্থিতি দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি শোনাচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা এখন ‘স্ট্যাগফ্লেশন’ শব্দটি বেশি ব্যবহার করছেন। অর্থাৎ একদিকে পণ্যের দাম আকাশচুম্বী (মূল্যস্ফীতি), অন্যদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থমকে গেছে (মন্দা)। ইউরোপের অনেক শিল্পোন্নত দেশ তাদের কারখানাগুলোতে বিদ্যুৎ সংযোগ কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে উৎপাদন কমছে, অথচ খরচ বাড়ছে, যা একটি বড় ধরনের বৈশ্বিক বেকারত্ব তৈরির আশঙ্কা তৈরি করছে।
জ্বালানি সংকটের মুখে অনেক দেশ বাধ্য হয়ে পুনরায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের যে লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে বিশ্ব এগোচ্ছিল, এই যুদ্ধ তাকে কয়েক ধাপ পিছিয়ে দিল। নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা রাতারাতি বাড়ানো সম্ভব নয়, আর এই সুযোগেই পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর বিকল্পগুলোর ব্যবহার বাড়ছে।
ইরান যুদ্ধের এই ‘জ্বালানি শক’ কেবল কতগুলো পরিসংখ্যানের খেলা নয়; এটি আধুনিক সভ্যতার টিকে থাকার লড়াই। তেলের ওপর অতিনির্ভরশীলতা কীভাবে বিশ্ব অর্থনীতিকে ভঙ্গুর করে তুলতে পারে, এই যুদ্ধ তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। শান্তি আলোচনা বা কূটনৈতিক সমাধান না আসা পর্যন্ত আগুনের এই উত্তাপ কেবল তেলের ব্যারেলই নয়, বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতাকেও ভেঙে চুরমার করবে।
সূত্র: আল জাজিরা আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ