ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রাপ্ত আসনের অনুপাতে সংরক্ষিত ৫০টি নারী আসনের মধ্যে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৩৬টি, জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট ১৩টি এবং স্বতন্ত্রদের জন্য রয়েছে একটি আসন।
আগামী ১২ মে অনুষ্ঠেয় সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় ছিল মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) বিকেল ৪টা পর্যন্ত। রিটার্নিং কর্মকর্তা ও ইসির যুগ্ম সচিব মো. মঈন উদ্দিন খান জানান, বিএনপি ও তাদের জোট থেকে ৩৬টি, জামায়াত জোট থেকে ১৩টি এবং স্বতন্ত্র হিসেবে একটি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন সুলতানা জেসমিন। এছাড়া আরও তিনজন—শাম্মা আক্তার, মোসাম্মদ মেহরুন্নেসা ও মাহবুবা রহমান স্বতন্ত্রভাবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন, যাদের বিষয়টি যাচাই-বাছাইয়ে স্পষ্ট হবে।
তবে মনোনয়নপত্র জমার দিনজুড়ে ইসি ভবনে গুঞ্জন ছিল, আইনি জটিলতায় জামায়াত জোটের একটি আসনের প্রার্থিতা বাতিল হতে পারে। এ ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন উঠেছে ‘জাতীয় নারীশক্তি’র কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মনিরা শারমিনের প্রার্থিতা নিয়ে।
তথ্য অনুযায়ী, মনিরা শারমিন ২০২৩ সালের ১১ নভেম্বর রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিশেষায়িত ব্যাংক বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে অফিসার জেনারেল (১০ম গ্রেড) পদে নিয়োগ পান। নিয়োগের পর তিনি প্রথমে ব্যাংকের কুষ্টিয়া শাখায় যোগ দেন। পরে ২০২৪ সালের আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাজধানীর কারওয়ান বাজার করপোরেট কার্যালয়ে বদলি হয়ে আসেন। মনিরা শারমিন ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এর আগে ২০২৫ সালের মার্চে তিনি এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব পান। অর্থাৎ সরকারি চাকরি থেকে অবসরের পাঁচ মাসের মাথায় তিনি সংসদ সদস্য পদে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন।
প্রাসঙ্গিক আইন অনুযায়ী, এটি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন ‘জাতীয় সংসদ (সংরক্ষিত মহিলা আসন) নির্বাচন আইন, ২০০৪’ অনুসারে অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে অন্যান্য বিধানের ক্ষেত্রে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ (আরপিও) প্রযোজ্য। আরপিও’র ১২(১)(চ) ধারায় বলা আছে, কোনো ব্যক্তি সরকারি চাকরি থেকে অবসর বা পদত্যাগের পর তিন বছর অতিক্রান্ত না হলে তিনি সংসদ সদস্য হওয়ার অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, সাধারণ ও সংরক্ষিত আসনের ক্ষেত্রে প্রার্থিতার যোগ্যতার মানদণ্ড একই। যাচাই-বাছাইয়ের সময়ই মনোনয়নপত্র বৈধ বা বাতিল হবে।
যদিও মনিরা শারমিন নিজের প্রার্থিতা নিয়ে আশাবাদী। তিনি বলেন, তার মনোনয়ন বাতিল হওয়ার সুযোগ নেই এবং বিষয়টি আরপিও’র সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়।
যদিও জামায়াতের অনেক রাজনৈতিকই প্রার্থীতা টিকে যাওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন, তবুও মনিরার অবস্থানকে সমর্থন করেছেন নির্বাচন কমিশনে জামায়াত জোটের মনোনীত প্রার্থীদের তালিকা দিতে আসা মুখপাত্র হামিদুর রহমান আযাদ।
তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে জানান, ‘আমরা আশাবাদী হব নারী আসনে যে আমরা কম্বাইন্ড তালিকা সাবমিট করেছি, এটার মধ্যে আর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী থাকার সুযোগ নেই। এই ১৩টি আসনে ১৩টি তালিকার ভিত্তিতে উনাদের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার কথা। আমরা আশা করি সেভাবেই নির্বাচনের ফলাফল আসবে।’
ইসি সূত্র বলছে, বিএনপির অন্তত তিনজন এবং জামায়াত জোটের মনিরা শারমিনের মনোনয়ন বাতিল হওয়ার কারণ রয়েছে। যদিও বিএনপির প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ত্রুটিগুলো তুলনামূলক কম আলোচিত, মনিরা শারমিনের বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
এদিকে, বিকল্প প্রার্থী হিসেবে এনসিপি নেতা নুসরাত তাবাসসুমের নাম আলোচনায় এসেছে। তবে ইসি সূত্রে জানা গেছে, তার মনোনয়ন নির্ধারিত সময়ের ১৯ মিনিট পর জমা পড়েছে, ফলে তা গ্রহণযোগ্য হওয়া নিয়েও জটিলতা আছে।
রিটার্নিং কর্মকর্তা মঈন উদ্দিন খান বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জামায়াত জোটের ১৩টি মনোনয়নপত্রই গ্রহণ করা হয়েছে। সময়ের পর জমা পড়া কোনো আবেদন আমলে নেওয়ার সুযোগ নেই।
সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনের জন্য দলগুলো মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে, মনোনয়নপত্র যদি কারও যাচাই-বাছাইয়ে বাতিল হয়, সেক্ষেত্রে কী হবে—জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, ‘যাচাই-বাছাইয়ে প্রার্থীতা বাতিল হলে আইন অনুযায়ী ওই সংরক্ষিত আসনটি সব দলের প্রার্থীর জন্য উন্মুক্ত হবে। নির্বাচন কমিশন এরপর নতুন তফসিল ঘোষণা করবে। তফসিল অনুযায়ী উন্মুক্ত আসনটিতে সব রাজনৈতিক দল বা জোট নতুন করে প্রার্থী মনোনয়ন দিবে, এরপর সংসদ সদস্যদের ভোটে ওই সংরক্ষিত আসনটিতে সদস্য নির্বাচন করা হবে।’
ইসি কর্মকর্তাদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে বিএনপি সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় উন্মুক্ত ভোটে তারা অতিরিক্ত একটি আসন পেতে পারে। ফলে বিএনপি জোটের আসন সংখ্যা ৩৭-এ উন্নীত হতে পারে এবং জামায়াত জোটের আসন কমে দাঁড়াতে পারে ১২টিতে।
তফসিল অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই হবে ২২ ও ২৩ এপ্রিল। আপিল গ্রহণ করা হবে ২৬ এপ্রিল এবং নিষ্পত্তি ২৭ ও ২৮ এপ্রিল। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ২৯ এপ্রিল, প্রতীক বরাদ্দ ৩০ এপ্রিল এবং ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে ১২ মে।