যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, পাকিস্তানের অনুরোধে ইরানের সঙ্গে আলোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়াবে এবং একই সঙ্গে ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ অব্যাহত থাকবে।
যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধির ঘোষণা দেওয়ায় ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। পাশপাশি তাকে স্বাগত জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস।
চলতি সপ্তাহেই বর্তমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে, যদিও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা পরিস্থিতি এখনো পরিষ্কার নয়। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স মঙ্গলবার ইসলামাবাদের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার কথা থাকলেও তিনি ওয়াশিংটন ছাড়েননি এবং হোয়াইট হাউস এখন বলছে, তার পাকিস্তান সফর বাতিল করা হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার জন্য প্রতিনিধিদল পাকিস্তানে পাঠানোর বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত নেয়নি ইরান।
গত ৮ এপ্রিল দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান, যার সময়সীমা বুধবার শেষ হচ্ছে। এর মধ্যেই কোনো চুক্তি না হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ আরোপ করা শুরু করে।
১৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা
বিবিসির হোয়াইট হাউস প্রতিবেদক বার্নড ডেবুসম্যান জুনিয়র লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র একদিকে যুদ্ধবিরতি বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ইরানের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে, যাতে তারা আলোচনায় ছাড় দেয়।
ওয়াশিংটনে স্থানীয় সময় মঙ্গলবার বিকেলে সাংবাদিকদের পাঠানো এক ঘোষণায় মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা ইরান, তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত ১৪ জন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও কিছু বিমানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে। তাদের অভিযোগ অনুযায়ী, এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ইরান সরকারের পক্ষ হয়ে অস্ত্র বা অস্ত্রের যন্ত্রাংশ সংগ্রহ বা পরিবহনে ভূমিকা রেখেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই ঘোষণার মানে হলো, নিষেধাজ্ঞাভুক্তদের যুক্তরাষ্ট্রে থাকা বা মার্কিনদের দখলে থাকা সব সম্পদ জব্দ করা হবে এবং সেগুলোর তথ্য জানাতে হবে। এ ছাড়া যেসব প্রতিষ্ঠানে এসব সত্তার সরাসরি বা পরোক্ষভাবে ৫০ শতাংশ বা তার বেশি মালিকানা রয়েছে, সেগুলোকেও একই নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
মার্কিন নাগরিকদের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে থাকা বা এমনকি অস্থায়ীভাবে সেখানে অবস্থানরত বিদেশিরাও এই সত্তাগুলোর সঙ্গে কোনো ধরনের লেনদেন করতে পারবেন না। মার্কিন সরকারের মতে, এসব সত্তা ইরানকে আবার ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সক্ষমতা পুনর্গঠনে সহায়তা করছে, যা অপারেশন এপিক ফিউরি চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্র বলছে, এই ঘোষণা একটি বৃহত্তর অভিযানের অংশ, যার নাম অপারেশন ইকনমিক ফিউরি। এর লক্ষ্য হলো ইরানের বিশ্ব আর্থিক বাজারে প্রবেশ বন্ধ করা এবং প্রশাসনের আশা অনুযায়ী, ইরানকে এমন একটি চুক্তিতে আসতে চাপ দেওয়া, যা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গ্রহণযোগ্য।
ওয়াশিংটনে দিনভর কূটনীতি
বিবিসির ওয়াশিংটন সংবাদদাতা ড্যানিয়েল বুশ লিখেছেন, ওয়াশিংটনে মঙ্গলবার ছিল কূটনৈতিক ব্যস্ততায় পূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সকে ইসলামাবাদে পাঠানোর জন্য এয়ার ফোর্স টু প্রস্তুত ছিল, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আরেক দফা শান্তি আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পরও এয়ার ফোর্স টু উড্ডয়ন করেনি এবং আলোচনা স্থগিত করা হয়।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধবিরতি, যা বুধবার সন্ধ্যায় শেষ হওয়ার কথা ছিল, তা বাড়ানো হবে, যাতে ইরান একটি ‘সমন্বিত প্রস্তাব’ তৈরির জন্য সময় পায় এবং যুদ্ধ শেষ করার পথ খুঁজে নিতে পারে।
এই সময়ের মধ্যে ট্রাম্প বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে চিন্তা করছিলেন আর বিশ্ব অপেক্ষা করছিল দেশগুলো যুদ্ধ শেষ করার দিকে এগোচ্ছে কিনা তা দেখার জন্য। ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত গত দুই সপ্তাহে দ্বিতীয়বারের মতো, যেখানে তিনি যুদ্ধ আরও বাড়ানোর হুমকি থেকে সরে এসেছেন। এর ফলে তিনি প্রায় দুই মাসের এই সংঘাত শেষ করার জন্য আরও সময় পেলেন।
অনিশ্চিত আলোচনার প্রভাব তেলের দামে
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনার অবস্থা এখনো অনিশ্চিত থাকায় বুধবার দিনের শুরুর লেনদেনে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ওঠানামা করেছে।
লেনদেন শুরুর দিকে দাম বাড়লেও পরে ব্রেন্ট ক্রুড প্রতি ব্যারেল ০.২ শতাংশ কমে ৯৮.৩২ ডলারে নেমে আসে। একইভাবে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট ০.৩ শতাংশ কমে ৮৯.৪১ ডলারে দাঁড়ায়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর থেকে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা চলছে। এর জবাবে তেহরান গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল লক্ষ্য করে হামলার হুমকি দিয়েছে।