অনিয়ম অনিঃশেষ, পর্ব-৫
রাজধানীর তেজগাঁও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সের একটি কক্ষ। বাইরে সাধারণ মানুষের ভিড়, ভেতরে ফাইলের স্তূপ। কিন্তু এই ফাইলগুলো সাধারণ কোনো কাগজ নয়; প্রতিটি পৃষ্ঠায় মিশে আছে সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস আর একদল কর্মকর্তার সীমাহীন দুর্নীতির লোভ। মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস এখন আর কেবল সরকারি দপ্তরে সীমাবদ্ধ নেই, এটি হয়ে উঠেছে দুর্নীতিবাজদের এক অনিয়মের দুর্গ। পিয়ন থেকে উমেদার, নকল নবিশ থেকে খোদ সাব-রেজিস্ট্রার, পুরো চেইনটি যেন এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা, যার একমাত্র জ্বালানিশক্তি হলো ঘুষ।
মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস মূলত ঢাকার তেজগাঁও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্স-এ অবস্থিত। মোহাম্মদপুর এলাকার জমি ও ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যক্রম সাধারণত এই তেজগাঁও অফিস থেকেই পরিচালিত হয়।
এই অফিসের দুর্নীতির সাম্রাজ্যের এক বিস্ময়কর চরিত্রের নাম আব্দুস সোবহান। ২০১৪ সালে দৈনিক মাত্র ৬০ টাকা হাজিরা মজুরিতে উমেদার হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু দশ বছর পর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে যখন দুদকের গোয়েন্দা শাখা তাকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে, তখন বেরিয়ে আসে এক শিউরে ওঠা তথ্য। ৬০ টাকার সেই অস্থায়ী কর্মী আজ শতকোটি টাকার মালিক! আদাবরে সাততলা বাড়ি, মোহাম্মদপুরে কয়েক ডজন ফ্ল্যাট, বছিলায় বিঘার পর বিঘা জমি আর স্ত্রীর নামে কোটি কোটি টাকার এফডিআর। প্রশ্ন উঠেছে, পিরামিডের সবচেয়ে নিচের স্তরের একজন কর্মীর যদি এই অবস্থা হয়, তবে চূড়ায় বসে থাকা রাঘববোয়ালদের সম্পদের পাহাড় কতটা উঁচু হতে পারে?
দুর্নীতির এই মলাট উন্মোচিত হতেই বেরিয়ে আসে মূল হোতার নাম, সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুল কাদির। অভিযোগ রয়েছে, বিগত সরকারের রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় তিনি গড়ে তুলেছেন প্রায় শত কোটি টাকার এক বিশাল সিন্ডিকেট। ২০২৩ সালের মে থেকে জুলাই মাসের মধ্যে অসংখ্য ভুয়া দলিল কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই কেবল মোটা অঙ্কের বিনিময়ে পাস করিয়েছেন তিনি। যার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ হলো দলিল নম্বর ৫১৩৬। সাংবাদিকরা অনুসন্ধান করতে গেলে তাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে তাড়িয়ে দেন আব্দুল কাদির। এটি তার নিত্যদিনের কাজ।
এই আব্দুল কাদিরের সম্পদের তালিকা যেন কোনো রূপকথার গল্পকে হার মানায়। তার বেতন-ভাতা এবং আয়ের সাথে সম্পদের হিসাব মেলে না। ঢাকার মোহাম্মদপুরে তিনটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, ঢাকা উদ্যানে ছয় কোটি টাকার প্লট এবং গ্রামের বাড়িতে অন্তত ২৫ কোটি টাকার স্থাবর সম্পত্তি আছে তার। তার স্ত্রী ও পুত্রের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে রয়েছে কোটি কোটি টাকার এফডিআর। অভিযোগ রয়েছে, পছন্দের এই অফিসে পোস্টিং পেতে তিনি নিজেই খরচ করেছেন কোটি কোটি টাকা। আর সেই টাকা উসুল করতে জমি কেনাবেচার প্রতিটি ধাপে ঘুষকে করেছেন সংবিধান। কেউ ঘুষ দিতে অস্বীকার করলে তার ফাইল ত্রুটি দেখিয়ে দিনের পর দিন আটকে রাখা হয়। এখানে টাকা দিলে সেবা, না দিলে অপেক্ষা, এই সংস্কৃতি এখন অলিখিত আইনে পরিণত হয়েছে।
মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের এই দুর্নীতি এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং এটি একটি সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধ। এই অন্ধকার জগতের নেতৃত্ব দিচ্ছেন চারজন—সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুল কাদির, সহকারী সাব-রেজিস্ট্রার হারিস, নকল নবিশ সমিতির নেতা আওলাদ হোসেন এবং তার ভাই কথিত স্টাফ আকিব হোসেন। এই চারজনের ইশারা ছাড়া মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে একটি ধূলিকণাও নড়ে না, ফাইল তো দূরের কথা।
সহকারী সাব-রেজিস্ট্রার হারিস, বাড়ি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে। গত কয়েক বছরে গড়ে তুলেছেন এক আর্থিক সাম্রাজ্য। নিজ গ্রামে পাঁচতলা এক রাজকীয় ভবন আর রাজধানীর মিরপুরে একাধিক ফ্ল্যাট যেন তার দুর্নীতির নীরব সাক্ষী। তাকে সরাসরি সহায়তা করেন আওলাদ হোসেন, যিনি সরকারি খাতায় একজন সামান্য নকল নবিশ। মাসে ২০-২৫ হাজার টাকা বেতনের এই কর্মচারী এখন প্রতি মাসে হাতিয়ে নিচ্ছেন কোটি টাকা। আওলাদ হোসেনের বিশেষত্ব হলো দলিলের দাগ, খতিয়ান ও মৌজা ঘষামাজা করে পরিবর্তন করা। নিরীহ মানুষকে অমানবিক মানসিক নির্যাতন করে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর সেই অবৈধ কাজগুলো সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুল কাদিরের খাস কামরায় বসে গোপনে সম্পাদিত হয়।
সিন্ডিকেটের চতুর্থ স্তম্ভ হলেন আওলাদের ছোট ভাই আকিব হোসেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই আকিবের কোনো সরকারি নিয়োগপত্রই নেই! কোনো পরিচয় নেই, তবুও তিনি অফিসের স্বঘোষিত উমেদার। তার মূল কাজ হলো ক্যাশ কালেকশন। দুদক বা প্রশাসনের চোখ এড়াতে এই নিয়োগবিহীন ব্যক্তিকে ব্যবহার করা হয়। আকিব হোসেন এলাকায় চিহ্নিত সন্ত্রাসী এবং ইয়াবা কারবারের সাথে জড়িত বলেও অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক নেতাদের নাম ভাঙিয়ে তিনি পুরো তেজগাঁও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন।
এই সিন্ডিকেটের লাইমলাইটে আরও আছেন মো. এনামুল, মো. মোস্তফা, মো. ইমরান ও মো. ইউসুফের মতো অসাধু ব্যক্তিরা। তারা ক্ষমতাসীন দলের নাম ভাঙিয়ে এবং স্থানীয় ভেন্ডর সমিতির মদদে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে রেখেছেন। সাংবাদিকরা সংবাদ সংগ্রহে গেলে তাদের হেনস্তা করা এবং ‘মব’ সৃষ্টি করে অপদস্থ করা এই সিন্ডিকেটের পুরোনো কৌশল।
গত ৬ এপ্রিল আব্দুল কাদিরের বিরুদ্ধে আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়ে এসব অভিযোগ সহকারে একাধিক লিখিত অভিযোগ জমা পড়লেও এক অদৃশ্য ক্ষমতাবলে তিনি এখনো বহাল আছেন। সাধারণ মানুষ প্রশ্ন তুলছেন, কীসের জুজুর ভয়ে নিবন্ধন অধিদপ্তর এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না? কেন একজন নিয়োগহীন আকিব হোসেন বছরের পর বছর অফিসের ছড়ি ঘোরাচ্ছেন? এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।
২৯ এপ্রিল সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুল কাদিরকে ফোনে কয়েক দফা যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি, এমনকি এই প্রতিবেদকের এসএমএসেরও কোনো উত্তর দেননি।