প্রতিদিন সংবাদপত্রের পাতায় এবং টেলিভিশন বা সামাজিক মাধ্যমের স্ক্রিনে যখন কোনো কন্যাসন্তানের ওপর নির্যাতন, নিগ্রহ কিংবা হত্যার খবর ভেসে ওঠে, তখন কেবল একটি নিষ্পাপ জীবনই শেষ হয় না; বরং ধূলিস্যাৎ হয়ে যায় রাষ্ট্রের মানবিকতার ভিত, প্রশ্নের মুখে পড়ে আমাদের সামষ্টিক বিবেক। বিচারের আশায় আদালতের বারান্দায় ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত কোনো বাবার চোখের জল কিংবা মেয়ের জামাকাপড় বুকে জড়িয়ে ধরে মায়ের বোবা কান্না আমাদের চেনা বিচারহীনতার সংস্কৃতিকেই মনে করিয়ে দেয়। এই করুণ বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আজ আমাদের আইনি, বিচারিক, সামাজিক এবং সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোর ফাঁকফোকরগুলো খতিয়ে দেখা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
মনস্তত্ত্বের খোলনলচে না বদলে আইনি ফাঁকা বুলি কেন? কাগুজে আইনের দিক থেকে বাংলাদেশের প্রস্তুতি কিন্তু কম নয়। আমাদের দেশে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০’ রয়েছে, রয়েছে যুগান্তকারী ‘শিশু আইন, ২০১৩’। আন্তর্জাতিকভাবেও বাংলাদেশ জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ (সিআরসি) এবং নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদে (সিইডিএডব্লিউ) স্বাক্ষরকারী অন্যতম অগ্রগামী দেশ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই শক্তিশালী আইনি ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারগুলো মাঠপর্যায়ে একটি কন্যাসন্তানের নিরাপত্তা দিতে কেন বারবার ব্যর্থ হচ্ছে? চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮-এর সাম্প্রতিক প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শিশু নির্যাতনের অভিযোগ ২০২২ সালের ৮ হাজার ২১টি থেকে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে ২০২৫ সালে ২৬ হাজার ৩০০-তে দাঁড়িয়েছে, যা প্রায় ২২৮ শতাংশ বৃদ্ধি নির্দেশ করে। একই সাথে শিশু হত্যার হার পূর্ববর্তী বছরগুলোর তুলনায় ১৪.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে বছরে ৪৮২ জনে দাঁড়িয়েছে। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে, কেবল আইনের প্রথিতযশা উপস্থিতি অপরাধের এই ভয়ানক বিস্তার রোধ করতে পারছে না। এর মূল কারণ আইনের অভাব নয়, বরং পদ্ধতিগত প্রাতিষ্ঠানিক গোলকধাঁধা এবং আমাদের গভীর সামাজিক মনস্তত্ত্বের ক্ষয়।
তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার দিকে তাকালে কয়েকটি পদ্ধতিগত অবহেলা ও ফাঁকফোকর স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথম ধাক্কাটি আসে থানা পর্যায়ে। মামলা গ্রহণে গড়িমসি, এজাহার বা এফআইআর দায়েরের সময় তথ্যের হেরফের এবং জেন্ডার-সংবেদনশীলতার চরম অভাব বিচার প্রাপ্তির পথকে শুরুতেই বাধাগ্রস্ত করে। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের বড় অংশেরই শিশু অধিকার ও জেন্ডার-সংবেদনশীলতার ওপর বিশেষায়িত কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ থাকে না। দ্বিতীয়ত, চিকিৎসাগত ও ফরেনসিক আলামতের সংকট। ধর্ষণের মতো স্পর্শকাতর অপরাধের ক্ষেত্রে ডিএনএ টেস্ট এবং মেডিকেল রিপোর্টই বিচারের মূল ভিত্তি। অথচ আমাদের দেশে জেলা পর্যায়ে আধুনিক ফরেনসিক ল্যাবের তীব্র ঘাটতি রয়েছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় এই রিপোর্টগুলো আসতে মাসের পর মাস, এমনকি বছরও লেগে যায়। এই দীর্ঘ সময়ে আলামত বিকৃত হওয়ার ঝুঁকি যেমন বাড়ে, তেমনি অপরাধীরা জামিনে বেরিয়ে এসে ভুক্তভোগী পরিবারকে মামলা তুলে নিতে চাপ ও হুমকি দিতে শুরু করে। তৃতীয়ত, বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা ও সাক্ষী সুরক্ষার অনুপস্থিতি। সবচেয়ে বড় আইনি শূন্যতা হলো একটি কার্যকর ‘সাক্ষী সুরক্ষা আইন’ না থাকা। বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকার কারণে সাক্ষীরা একপর্যায়ে ভয়, প্রলোভন কিংবা ক্লান্তিতে আদালতে আসা বন্ধ করে দেয়। এটি চূড়ান্ত বিচারে সাজাপ্রাপ্তির হার কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ।
তবে এই বিচারিক গোলকধাঁধার চেয়েও বড় সংকট লুকিয়ে আছে আমাদের সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও পুরুষ মনস্তত্ত্বে। অপরাধের আইনি প্রতিকার তো পরের ধাপ, কিন্তু অপরাধ কেন ঘটছে—তার মূলে হাত না দিলে এই পরিস্থিতি পাল্টাবে না। আন্তর্জাতিক পুরুষ ও জেন্ডার সমতা সমীক্ষা এবং বিভিন্ন সমাজতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষতান্ত্রিক সামাজিকীকরণ প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের মধ্যে এক ধরনের ‘ক্ষমতা ও আধিপত্যের’ মনস্তত্ত্ব তৈরি করে, যেখানে নারী ও শিশু অবদমনকে অবচেতনভাবেই বৈধ মনে করা হয়। এই বিষাক্ত মনস্তত্ত্ব বা টক্সিক ম্যাসকুলিনিটি রাতারাতি তৈরি হয় না; এর বীজ রোপিত হয় পরিবার নামক সবচেয়ে শক্তিশালী সামাজিক প্রতিষ্ঠানে।
আমাদের পরিবারগুলোতে আজো ছেলে শিশুকে বড় করা হয় এক বিশেষ একচেটিয়া অধিকারের মনস্তত্ত্ব দিয়ে। মেয়ে শিশুটি যখন ঘরের কাজ সামলাচ্ছে, ছেলে শিশুটি তখন দেখছে ঘরের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন বাবা বা পরিবারের পুরুষ সদস্যরা। এই বৈষম্যমূলক পারিবারিক পরিবেশই ছেলে শিশুর অবচেতন মনে গেঁথে দেয় যে, সে শ্রেষ্ঠ এবং নারী বা কন্যাসন্তান তার অধীনস্থ বা ভোগের বস্তু। তাই কন্যাসন্তানের ওপর সহিংসতা বন্ধের প্রথম পাঠ শুরু হতে হবে পরিবারে। ছেলে শিশুকে কেবল ‘রক্ষণশীল অভিভাবকত্ব’ নয়, বরং জেন্ডার-সংবেদনশীল মানবিক মনস্তত্ত্ব দিয়ে বড় করতে হবে। তাকে শেখাতে হবে ঘরের কাজে সমভাগী হতে, তাকে বোঝাতে হবে সম্মতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের প্রকৃত অর্থ। কন্যাসন্তান কোনো দুর্বল বা করুণার পাত্রী নয়, সে সমান অধিকারসম্পন্ন মানুষ—এই বোধ ছেলে শিশুর মনে শৈশবেই গেঁথে দিতে হবে।
একই সাথে, প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের এই ‘মাইন্ডসেট কারেকশন’ বা মনস্তাত্ত্বিক সংস্কারের জন্য সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দায় নিতে হবে। আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোর মতো সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে তাদের চিরাচরিত ভূমিকার খোলস ভাঙতে হবে। বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে কেবল তাত্ত্বিক নৈতিকতা নয়, বরং জেন্ডার সমতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার ব্যবহারিক পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রবক্তারা যদি তাদের জুমার খুতবা বা ধর্মীয় সভায় নারীর মর্যাদা এবং কন্যাসন্তানের সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে প্রচার করেন, তবে তা গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারে। রাষ্ট্র ও সমাজকে যৌথভাবে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে পুরুষত্ব মানে আধিপত্য নয়, বরং পুরুষত্ব মানে হবে দায়িত্বশীলতা ও মানবিকতা।
এই রূপান্তরের যাত্রায় আমাদের সিভিল সোসাইটি ও গণমাধ্যমকেও তাদের প্রথাগত ভূমিকার বাইরে এসে দাঁড়াতে হবে। আমাদের দেশের সিভিল সোসাইটির ভূমিকা এখন মূলত সামাজিক মাধ্যমে ক্ষণস্থায়ী ক্ষোভ প্রকাশ, মোমবাতি প্রজ্বলন, মানববন্ধন এবং চেনা ছকের প্রেস বিবৃতির গণ্ডিতে আটকে গেছে। এই ‘প্রতীকী প্রতিবাদ’ বা টোকেন অ্যাক্টিভিজম জনসচেতনতা তৈরি করলেও কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে পারে না। এখন সময় এসেছে মানববন্ধন থেকে বেরিয়ে ‘সিস্টেমিক ট্র্যাকিং’ বা পদ্ধতিগত নজরদারিতে যুক্ত হওয়া। প্রতিটি জেলায় সিভিল সোসাইটির উদ্যোগে ‘লিগ্যাল ওয়াচডগ বডি’ গঠন করা যেতে পারে, যা থানা থেকে শুরু করে আদালত পর্যন্ত ভুক্তভোগী শিশুর মামলাটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। কোনো ধাপে অনিয়ম বা অবহেলা দেখলে তারা ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষে কৌশলগত জনস্বার্থ মামলা দায়ের করে সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে জবাবদিহির আওতায় আনবে।
বিশ্বের অনেক দেশেই সিভিল সোসাইটি ও মিডিয়ার এমন প্রাতিষ্ঠানিক চাপ ও অংশীদারত্ব রাষ্ট্রকে বদলে দিতে বাধ্য করেছে। যেমন প্রতিবেশী দেশ ভারতে ২০১২ সালের নির্ভয়া কাণ্ডের পর সিভিল সোসাইটি ও গণমাধ্যমের নজিরবিহীন ও সুনির্দিষ্ট চাপের মুখে ‘জাস্টিস বর্মা কমিটি’ গঠিত হয়েছিল, যা দেশটির ফৌজদারি আইনে ব্যাপক পরিবর্তন আনে। শুধু আইন পরিবর্তনই নয়, ভারতের সিভিল সোসাইটি ও মিডিয়া যৌথভাবে ফাস্ট-ট্র্যাক কোর্টগুলোর মামলার নিষ্পত্তি এবং বিশেষ ফান্ডের সঠিক ব্যবহার নিয়মিত অডিট ও ট্র্যাকিং করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলে, যা বিচার প্রক্রিয়ার গতি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আরেকটি সফল উদাহরণ হতে পারে দক্ষিণ আফ্রিকার ‘থুথুজেলা কেয়ার সেন্টার’ মডেল। এটি মূলত একটি ‘ওয়ান-স্টপ ওয়ান-রুফ’ মডেল, যেখানে সরকারের সাথে সিভিল সোসাইটি সরাসরি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে কাজ করে। একই ছাদের নিচে ভুক্তভোগী শিশুর চিকিৎসা, মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং, আইনি সহায়তা এবং আদালতের জন্য সাক্ষ্য প্রস্তুত করার কাজ করা হয়। এর ফলে সেখানে অপরাধীদের সাজা পাওয়ার হার নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশের সিভিল সোসাইটিও কেবল বিবৃতির বৃত্তে না থেকে সরকারকে সাথে নিয়ে এমন সমন্বিত মডেল মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নে বাধ্য করতে পারে।
একইভাবে, গণমাধ্যমকে কেবল ‘অপরাধের রোমহর্ষক ও সংবেদনশীল বিবরণ’ প্রকাশের সাময়িক চাঞ্চল্য থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। একটি পাশবিক অপরাধ ঘটার পর প্রথম কয়েক দিন যে মিডিয়া ট্রায়াল বা আলোড়ন তৈরি হয়, এক মাস পর সেই মামলার চার্জশিট ঠিকঠাক দেওয়া হলো কি না, কিংবা সাক্ষীরা নিরাপদে আদালতে যেতে পারছে কি না—তা নিয়ে আমাদের গণমাধ্যমে ফলো-আপের তীব্র অভাব দেখা যায়। গণমাধ্যমকে হতে হবে ‘ফলো-আপ সাংবাদিকতা’র অগ্রদূত। প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট পাতায় বা বিশেষ প্রতিবেদনে নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার অগ্রগতির একটি ‘ইনডেক্স’ বা সূচক প্রকাশ করা উচিত, যা পুরো বিচার ব্যবস্থার ওপর একটি নিয়মতান্ত্রিক ও নৈতিক চাপ বজায় রাখবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, আজ যে কন্যাসন্তানটি বিচারের দাবিতে বা নিরাপত্তার অভাবে নিভৃতে কাঁদছে, সে অন্য কেউ নয়—সে আমাদেরই ভবিষ্যৎ। রাষ্ট্রের আইন, পুলিশের খাতা আর আদালতের নথির গোলকধাঁধায় পড়ে যেন আর কোনো কুঁড়ি ফোটার আগেই ঝরে না যায়। কাগজের আইনকে মাঠে কার্যকর করতে এবং পুরুষ মনস্তত্ত্বের আমূল পরিবর্তন ঘটাতে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সুশীল সমাজ এবং মিডিয়ার এই চতুর্মুখী ও কার্যকর সমন্বয়ই পারে আমাদের কন্যাসন্তানদের জন্য একটি নিরাপদ ও ন্যায়সংগত বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে। আর কত রক্ত ঝরলে, আর কত শৈশব পিষে মরলে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক বিবেক জাগ্রত হবে? উত্তরটি আমাদের আজই খুঁজতে হবে, কথার ফুলঝুরিতে নয়, বরং কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে।
লেখক: আইন গবেষক এবং উন্নয়নকর্মী