পৃথিবীর ছাদ বলা হয় যে পর্বতকে, সেই এভারেস্ট আবারও দেখল বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা। নেপালের সময় বুধবার (২৭ মে) ভোর ৫টা ২৪ মিনিটে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ জয় করেছেন বাংলাদেশি পর্বতারোহী নুরুন্নাহার নিম্নি। প্রায় ২৯ হাজার ফুট উঁচু বরফঢাকা মৃত্যুপথ পেরিয়ে তিনি দাঁড়িয়েছেন পৃথিবীর সর্বোচ্চ বিন্দুতে। সেখানে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে তিনি শুধু নিজের স্বপ্ন পূরণ করেননি, নতুন করে লিখেছেন বাংলাদেশের নারী অভিযাত্রার ইতিহাসও।
বাংলাদেশের এভারেস্ট অভিযাত্রার ইতিহাস গৌরবের। ২০১০ সালের ২৩ মে মুসা ইব্রাহীম বাংলাদেশের প্রথম এভারেস্টজয়ী হিসেবে ইতিহাস গড়েন। ২০১১ সালের ২১ মে এম এ মুহিত দ্বিতীয় বাংলাদেশি হিসেবে এভারেস্ট জয় করেন। পরের বছর ২০১২ সালের ২০ মে তিনি আবারও পর্বতটির চূড়ায় ওঠেন। ২০১২ সালের ১৯ মে নিশাত মজুমদার বাংলাদেশের প্রথম নারী এভারেস্টজয়ী হন। একই বছরের ২৬ মে ওয়াসফিয়া নাজরীন এভারেস্ট জয় করেন। মোহাম্মদ খালেদ হোসেন ২০১৩ সালের ২১ মে এভারেস্ট জয় করেন। তিনি সজল খালেদ নামে পরিচিত। দুর্ভাগ্যবশত চূড়া জয় করার পর নামার পথে আট হাজার ৬০০ মিটার উচ্চতায় ‘অজানা কারণে’ মারা যান খালেদ।
এভারেস্ট জয় মানে শুধু পাহাড়ে ওঠা নয়। এটি আসলে মৃত্যু আর জীবনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে মানুষের সীমা পরীক্ষা করার গল্প। যেখানে অক্সিজেন কমে যায়, শরীর কাজ করা বন্ধ করে দেয়, তীব্র ঠান্ডায় হাত-পা জমে আসে, আর এক পা ভুল হলেই হাজার ফুট গভীর খাদ। সেই ভয়ংকর পথেই এবার ইতিহাস গড়লেন বাংলাদেশের নিম্নি।
বাংলাদেশে পাহাড়চর্চার ইতিহাস খুব পুরোনো নয়। সমতলের দেশ হওয়ায় এখানে পর্বতারোহণের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে খুব ধীরে। কিন্তু গত দুই দশকে কিছু তরুণ-তরুণী অসম্ভবকে সম্ভব করার স্বপ্ন নিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন। তাদেরই একজন নুরুন্নাহার নিম্নি। দীর্ঘ প্রস্তুতি, বরফে অনুশীলন, উচ্চতাজনিত অসুস্থতার ঝুঁকি, শারীরিক ও মানসিক যুদ্ধ সবকিছু পেরিয়ে তিনি পৌঁছেছেন এভারেস্টের চূড়ায়।
বিশ্বে এভারেস্ট জয়ের ইতিহাস শুরু হয়েছিল ১৯৫৩ সালে। নিউজিল্যান্ডের এডমন্ড হিলারি এবং নেপালের শেরপা তেনজিং নোরগে প্রথম মানুষ হিসেবে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ স্পর্শ করেন। সেই মুহূর্তটি শুধু পর্বতারোহণের নয়, মানব ইতিহাসেরও এক বড় অর্জন হয়ে আছে। কিন্তু এভারেস্টের গল্পে নারীদের পদচারণা শুরু হতে আরও সময় লাগে।
১৯৭৫ সালে জাপানের জুনকো তাবেই প্রথম নারী হিসেবে এভারেস্ট জয় করেন। তার সেই যাত্রা সহজ ছিল না। পুরুষশাসিত পর্বতারোহণ দুনিয়ায় তাকে বারবার শুনতে হয়েছিল, ‘নারীরা এভারেস্টে উঠতে পারে না।’ কিন্তু সব অবিশ্বাসকে পেছনে ফেলে জুনকো দাঁড়িয়েছিলেন পৃথিবীর ছাদে। এরপর থেকেই এভারেস্ট নারীদের জন্যও সাহসের প্রতীক হয়ে ওঠে।
তারপর ধীরে ধীরে পৃথিবীর নানা দেশ থেকে নারী পর্বতারোহীরা এভারেস্টে উঠতে শুরু করেন। কেউ নিজের সীমা ভাঙতে, কেউ দেশকে পরিচিত করতে, কেউ আবার প্রমাণ করতে যে পাহাড় লিঙ্গ দেখে না। কিন্তু এভারেস্ট একইসঙ্গে নির্মমও।
বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক এই শৃঙ্গ বহু প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। বরফধস, অক্সিজেন সংকট, তুষারঝড়, শরীরের তাপমাত্রা হঠাৎ কমে যাওয়া সব মিলিয়ে এভারেস্টকে বলা হয় ‘মৃত্যুর করিডোর’। সবচেয়ে ভয়ংকর অংশটি হলো চূড়ার পথে মৃত্যু অঞ্চল, যেখানে মানুষের শরীর ধীরে ধীরে ভেঙে পড়তে থাকে। অনেক সময় অভিজ্ঞ পর্বতারোহীরাও সেখানে অসুস্থ হয়ে পড়েন।
নারী পর্বতারোহীদের জন্য চ্যালেঞ্জ আরও কঠিন। শারীরিক সক্ষমতার পাশাপাশি সামাজিক বাধাও পেরোতে হয় তাদের। দক্ষিণ এশিয়ার বহু সমাজেই এখনো পাহাড়চর্চাকে নারীদের জন্য অস্বাভাবিক ভাবা হয়। পরিবার, অর্থনৈতিক সংকট, প্রশিক্ষণের অভাব সবকিছু মিলিয়ে নারীদের জন্য এভারেস্ট যাত্রা আরও কঠিন হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশেও একই বাস্তবতা দেখা গেছে। বাংলাদেশের প্রথম নারী হিসেবে এভারেস্ট জয় করেছিলেন নিশাত মজুমদার। ২০১২ সালে তার সেই অর্জন গোটা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। ছোট্ট একটি দেশের এক তরুণী পৃথিবীর সর্বোচ্চ চূড়ায় দাঁড়িয়ে প্রমাণ করেছিলেন, ইচ্ছাশক্তি থাকলে অসম্ভব বলে কিছু নেই। পরে ওয়াসফিয়া নাজরীনও এভারেস্ট জয় করেন এবং আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হন। বাংলাদেশের নারী অভিযাত্রার নতুন দরজা খুলে দেন তারা।
এবার সেই তালিকার তিন নম্বরে যুক্ত হলো নুরুন্নাহার নিম্নির নাম। তবে তার এই সাফল্যের পেছনেও আছে দীর্ঘ সংগ্রাম। কারণ এভারেস্টে ওঠা শুধু সাহসের ব্যাপার নয়; এটি অর্থ, প্রশিক্ষণ, শারীরিক সক্ষমতা এবং মানসিক দৃঢ়তারও যুদ্ধ। অনেক পর্বতারোহী বছরের পর বছর প্রস্তুতি নেন। কেউ আবার মাঝপথে ফিরে আসতে বাধ্য হন।
এভারেস্টের আরেকটি অন্ধকার বাস্তবতাও আছে। প্রতি বছর সেখানে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান অনেকে। বরফের নিচে চাপা পড়ে, অক্সিজেন শেষ হয়ে, কিংবা তীব্র ঠান্ডায় শরীর অচল হয়ে মারা যান পর্বতারোহীরা। সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, অনেকের মরদেহ আর নামানোও সম্ভব হয় না। তারা চিরদিনের মতো বরফের ভেতর পড়ে থাকে।
২০১৪ সালে ভয়াবহ তুষারধসে বহু শেরপা নিহত হন। ২০১৫ সালে নেপালের ভূমিকম্পের পর এভারেস্ট ঘাঁটিতেও ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসে। এরপরও মানুষ এভারেস্টে ওঠা বন্ধ করেনি। কারণ এভারেস্ট শুধু পাহাড় নয়, এটি মানুষের সীমা অতিক্রম করার প্রতীক।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এভারেস্ট নিয়ে আরেকটি বিতর্কও তৈরি হয়েছে। অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণের কারণে সেখানে মানুষের ভিড় বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া অনেক ছবিতে দেখা গেছে, চূড়ার কাছে পর্বতারোহীদের দীর্ঘ লাইন। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যথেষ্ট প্রস্তুতি ছাড়া অনেকেই শুধু ‘রেকর্ড’ গড়তে গিয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন।
তবু এসব ভয় থামাতে পারেনি নুরুন্নাহার নিম্নিদের। কারণ পাহাড়ের প্রতি এক ধরনের অদ্ভুত টান থাকে। যারা একবার বরফের রাজ্যে পা রাখে, তারা বারবার ফিরে যেতে চায়। আর সেই টান থেকেই বাংলাদেশের মেয়েরা এখন একের পর এক নতুন ইতিহাস লিখছে।
নুরুন্নাহার নিম্নির এই জয় শুধু একটি ব্যক্তিগত সাফল্য নয়। এটি বাংলাদেশের নারী সমাজের জন্যও বড় বার্তা। এই অর্জন বলে দেয়, বাংলাদেশের নারীরা এখন শুধু ঘরের ভেতর সীমাবদ্ধ নেই। তারা পৃথিবীর সর্বোচ্চ চূড়াতেও নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছে।
এভারেস্টের চূড়ায় দাঁড়িয়ে হয়তো তখন চারপাশে শুধু বরফ আর মেঘ ছিল। কিন্তু সেই মুহূর্তে বাংলাদেশের কোটি মানুষের স্বপ্নও ছিল তার সঙ্গে। কারণ একটি ছোট দেশের এক নারী যখন পৃথিবীর সর্বোচ্চ স্থানে পতাকা ওড়ান, তখন সেটি কেবল একটি অভিযানের গল্প থাকে না, সেটি হয়ে ওঠে পুরো জাতির গর্বের গল্প।
আজ নুরুন্নাহার নিম্নির নাম শুধু একজন পর্বতারোহীর নাম নয়। এটি সাহসের নাম, সীমা ভাঙার নাম, অসম্ভবকে ছুঁয়ে ফেলার নাম। আর সেই কারণেই এভারেস্টের বরফঢাকা চূড়ায় এবারও শুধু একটি পতাকা ওড়েনি, উড়েছে বাংলাদেশের নারীদের নতুন আত্মবিশ্বাসের জয়গানের পতাকাও।