সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে আগে থেকেই বিতর্ক চলছিল। এবার তাতে নতুন করে ঘি ঢাললেন সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। তার ওই বিস্ফোরক মন্তব্যের পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ফের বিতর্ক শুরু হয়েছে। সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন দাবি করেছেন, সরকার পরিচালনার আনুষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে একটি ছোট গোষ্ঠীই বড় বড় সিদ্ধান্ত নিত। তার ভাষায়, সাত সদস্যের একটি ‘কিচেন কেবিনেট’ ছিল, যেখানে প্রতি মঙ্গলবার বৈঠক হতো এবং সেখানেই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো।
বেসরকারি এক টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একাধিক উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ ছিল। সিদ্ধান্ত গ্রহণে জটিলতা ও মতপার্থক্যের কারণে তিনি অন্তত তিনবার পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন। তবে তার পদত্যাগ গ্রহণ করা হয়নি।’
তৌহিদ হোসেনের এই বক্তব্য সামনে আসার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ এর আগেও অন্তর্বর্তী সরকারের আরেক সাবেক উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন একই ধরনের অভিযোগ তুলেছিলেন। তিনি দাবি করেছিলেন, সরকারের অনেক বড় সিদ্ধান্ত উপদেষ্টা পরিষদের আনুষ্ঠানিক বৈঠকে নয়, বরং বাইরের একটি বলয়ের মাধ্যমে নেওয়া হতো। তার ভাষায়, ‘ভিন্নমত পোষণকারীদের মতামত খুব একটা গুরুত্ব পেত না।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘কিচেন কেবিনেট’ শব্দটি নতুন নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আনুষ্ঠানিক মন্ত্রিসভার বাইরে শাসকপ্রধানের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ব্যক্তি নিয়ে গড়ে ওঠা অনানুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী বলয়কে এভাবে বর্ণনা করা হয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতেও অতীতে বিভিন্ন সময় এই অভিযোগ উঠেছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক দুই উপদেষ্টার মুখে একই ধরনের বক্তব্য নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
সরকারের ভেতরে সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে বিতর্কের প্রসঙ্গে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলও আগে মন্তব্য করেছিলেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘পৃথিবীর সব সরকারের ভেতরেই সরকার থাকে।’ তার এই বক্তব্য তখন রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। অনেকে সেটিকে অনানুষ্ঠানিক ক্ষমতাকেন্দ্রের ইঙ্গিত হিসেবে দেখেছিলেন।
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই বিতর্ক আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, প্রশাসনিক নিয়োগ, নির্বাচন প্রস্তুতি এবং বৈদেশিক সম্পর্ক নিয়ে আগেই নানা প্রশ্ন উঠেছিল। এখন সাবেক উপদেষ্টাদের বক্তব্য সেই প্রশ্নগুলোকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকার সাধারণত একটি সংকটকালীন কাঠামো। সেখানে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন হয়। কিন্তু যখন আনুষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগ ওঠে, তখন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। বিশেষ করে রাষ্ট্র পরিচালনায় কারা প্রকৃত প্রভাব রাখছিলেন, সেটি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।
তৌহিদ হোসেনের বক্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ কেউ এটিকে ‘রাষ্ট্রের ভেতরে আরেক রাষ্ট্র’ বলে উল্লেখ করছেন। আবার অনেকে মনে করছেন, সংকটকালীন পরিস্থিতিতে ছোট পরিসরে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন থেকেই এমন কাঠামো তৈরি হয়েছিল।
তবে এখন পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকারের শীর্ষ নেতৃত্ব এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া দেয়নি। রাজনৈতিক মহল মনে করছে, বিষয়টি নিয়ে সামনে আরও বিতর্ক ও পাল্টাপাল্টি বক্তব্য আসতে পারে। কারণ দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা এবং সেই সময়ের ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে আলোচনা এখনো শেষ হয়নি।