দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মাত্র ৯ দিনের ব্যবধানে পাঁচ শিশুকে হত্যার খবর মিলেছে, যার মধ্যে চারজনকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যাও করা হয়েছে। এসব ঘটনা পুরো জাতিকে নাড়িয়ে দিয়েছে। ঢাকার মিরপুর, সিলেট, ঠাকুরগাঁও ও মুন্সীগঞ্জে ঘটে যাওয়া এসব পৈশাচিক অপরাধ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে রাজনৈতিক, সামাজিক ও মানবাধিকার অঙ্গনে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শিশুদের নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে সর্বত্র। সামাজিক মাধ্যমে এ নিয়ে অনেকে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মিরপুরে সাত বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করা হয়। ঘাতক এখানেই থামেনি, ছোট শিশুর মৃতদেহ বালতিতে লুকিয়ে রাখে। এই ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত প্রতিবেশী সোহেল রানা (৩৪) ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
একই সময়ে সিলেট ও ঠাকুরগাঁওয়ে পৃথক ঘটনায় চার বছর বয়সী দুই শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। মুন্সীগঞ্জেও ১০ বছর বয়সী এক কন্যাশিশু একই ধরনের নৃশংসতার শিকার হয়। ঘটনাগুলোর ধরন ও শিশুদের বয়স সমাজকে আরও বেশি নাড়া দিয়েছে। প্রতিটি ঘটনায় পরিবারগুলোর আহাজারি ও বিচার নিয়ে হতাশা সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর ভাষ্য, দেশে শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়লেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দ্রুত বিচার নিশ্চিত হয় না। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এবং মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণেও বলা হয়েছে, শিশু নির্যাতনের বহু মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর পরিবার সামাজিক চাপ, ভয় বা আর্থিক দুর্বলতার কারণে আইনি লড়াই চালিয়ে যেতে পারে না। ফলে অপরাধীদের মধ্যে এক ধরনের দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে।
অপরাধ বিশ্লেষক ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এসব ঘটনার পেছনে কেবল ব্যক্তিগত বিকৃতি নয়, বরং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কাজ করছে। মাদকাসক্তির বিস্তার, সহিংস ও বিকৃত অনলাইন কনটেন্টের সহজলভ্যতা, পরিবার ও সমাজে নৈতিক শিক্ষার দুর্বলতা ও অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার ঘটনায় দ্রুত তদন্ত ও বিচার না হলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন থাকলেও বাস্তব প্রয়োগে ঘাটতি রয়েছে। তারা শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মামলাগুলোর জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিচার সম্পন্ন ও দোষীদের দ্রুততম সময়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণ মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, প্রতিবারই আমরা বিচার চাই, কিন্তু বিচার দেখতে পাই না। অনেকে প্রশ্ন তুলছেন, শিশুদের জন্য নিরাপদ সমাজ গঠনে রাষ্ট্র কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে? বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন, প্রতিবাদ সমাবেশ ও স্মরণসভা আয়োজনের খবরও পাওয়া গেছে।
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, এখন শুধু আবেগ বা সাময়িক প্রতিবাদ নয়, বরং শিশু সুরক্ষাকে জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের বিরুদ্ধে এ ধরনের ধারাবাহিক সহিংসতা কেবল বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি সমাজের গভীর সংকটের বহিঃপ্রকাশ। রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার যদি এখনই কঠোর অবস্থান না নেয়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।