চাঁদে মানুষ পাঠানোর স্বপ্ন বাস্তব করতে আরেক ধাপ এগিয়ে গেল চীন। দেশটি এবার এমন এক মহাকাশ মিশন শুরু করতে যাচ্ছে, যেখানে একজন নভোচারী টানা এক বছর মহাকাশ স্টেশনে অবস্থান করবেন। চীনের ইতিহাসে এটিই হবে সবচেয়ে দীর্ঘ মানব মহাকাশ অভিযান। বিশ্লেষকেরা বলছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদে মানুষ পাঠানোর লক্ষ্য সামনে রেখেই বেইজিং এই প্রস্তুতি জোরদার করছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, চীনের মানব মহাকাশ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, শেনঝৌ-২৩ মহাকাশযানটি রোববার (২৪ মে) রাতে উত্তর-পশ্চিম চীনের জিউকুয়ান উৎক্ষেপণ কেন্দ্র থেকে উৎক্ষেপণ করার কথা। বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী এটি ২৪ মে মধ্যরাতের দিকে যাত্রা শুরু করার কথা। এতে তিনজন নভোচারী থাকবেন। তাদের মধ্যে আছেন সাবেক হংকং পুলিশ কর্মকর্তা লাই কা-ইং। তিনিই প্রথম হংকংবাসী হিসেবে চীনের মহাকাশ অভিযানে অংশ নিচ্ছেন। বাকি দুজন হলেন ঝু ইয়াংঝু ও ঝাং ইউয়ানঝি, যারা চীনের সামরিক নভোচারী ইউনিটের সদস্য।
চীনের মানব মহাকাশ সংস্থা জানায়, তিনজনের মধ্যে একজনকে পুরো এক বছর তিয়ানগং মহাকাশ স্টেশনে রাখা হবে। পরে পরিস্থিতি ও মিশনের অগ্রগতি দেখে ঠিক করা হবে কে থাকবেন। এখন পর্যন্ত রাশিয়ার এক নভোচারী সবচেয়ে দীর্ঘ সময়, প্রায় সাড়ে ১৪ মাস মহাকাশে ছিলেন। সেই রেকর্ড ভাঙতে না পারলেও চীনের জন্য এটি বিশাল পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চীন গত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে নিজেদের মহাকাশ সক্ষমতা বাড়িয়েছে। ২০২১ সাল থেকে তারা নিয়মিত নভোচারীদের মহাকাশ স্টেশনে পাঠাচ্ছে। তবে এবারের মিশনের গুরুত্ব আরও বেশি, কারণ এটি সরাসরি চাঁদ অভিযানের প্রস্তুতির অংশ। চীন চাইছে ২০৩০ সালের আগেই নিজেদের নভোচারীকে চাঁদের মাটিতে নামাতে।
এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে এক ধরনের নতুন প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ সংস্থা ২০২৮ সালের মধ্যে আবার মানুষকে চাঁদে পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। তাদের লক্ষ্য ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহে মানুষ পাঠানোর ভিত্তি তৈরি করা। অন্যদিকে চীন রাশিয়াকে সঙ্গে নিয়ে ২০৩৫ সালের মধ্যে চাঁদে স্থায়ী গবেষণা ঘাঁটি গড়ার স্বপ্ন দেখছে।
ওয়াশিংটন বহুদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছে, চীন শুধু বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য নয়, ভবিষ্যতে চাঁদের সম্পদ ও ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণের দিকেও নজর দিচ্ছে। তবে বেইজিং এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করেছে।
গত এপ্রিলেই যুক্তরাষ্ট্রের চার নভোচারী চাঁদের চারপাশে ঐতিহাসিক ভ্রমণ সম্পন্ন করেন। অর্ধশতাব্দীর মধ্যে এটিই ছিল মানুষের অংশগ্রহণে প্রথম চন্দ্র অভিযান। এর মধ্যেই ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স নতুন প্রজন্মের বিশাল রকেটের পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন সফলভাবে সম্পন্ন করেছে, যা ভবিষ্যতে চাঁদ ও মঙ্গল অভিযানে ব্যবহার করা হবে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, চীনের সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। কারণ মহাকাশ স্টেশন আর চাঁদের পরিবেশ এক নয়। পৃথিবীর কাছাকাছি কক্ষপথে থাকা তুলনামূলক নিরাপদ হলেও চাঁদে নামা অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এজন্য চীনকে সম্পূর্ণ নতুন প্রযুক্তি, সফটওয়্যার এবং অবতরণ ব্যবস্থা তৈরি করতে হচ্ছে।
এরই মধ্যে চীন লং মার্চ-১০ ভারী রকেট, মেংঝৌ মহাকাশযান এবং লানইউয়ে চন্দ্র অবতরণযানের নিরাপত্তা পরীক্ষা শুরু করেছে। এবারের শেনঝৌ-২৩ মিশনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মহাকাশ স্টেশনের সঙ্গে দ্রুত সংযোগ স্থাপনের একটি নতুন প্রযুক্তিও পরীক্ষা করা হবে, যা ভবিষ্যতের চাঁদ অভিযানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু প্রযুক্তি নয়, দীর্ঘ সময় মহাকাশে থাকলে মানুষের শরীর ও মনের ওপর কী প্রভাব পড়ে, সেটিও খতিয়ে দেখছে চীন। বিকিরণ, হাড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়া, মানসিক চাপ এবং দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতার প্রভাব নিয়ে গবেষণা হবে এই মিশনে।
সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো, চীন মহাকাশে মানুষের কৃত্রিম ভ্রূণ তৈরির পরীক্ষাও শুরু করেছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, মানব কোষের নমুনা আগের মিশনের নভোচারীদের কাছে পাঠানো হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো, দীর্ঘ সময় মহাকাশে মানুষ কীভাবে বাঁচতে ও বংশবিস্তার করতে পারে, তা বোঝা।
বিশ্লেষকদের মতে, মহাকাশ এখন শুধু বিজ্ঞান নয়; এটি ভবিষ্যতের ভূরাজনীতি, প্রযুক্তি ও শক্তির প্রতিযোগিতার বড় ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। আর সেই প্রতিযোগিতায় চীন এখন আর শুধু অংশগ্রহণকারী নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী।
সূত্র: রয়টার্স, চীনের মানব মহাকাশ সংস্থা, আন্তর্জাতিক মহাকাশ বিশ্লেষণ প্রতিবেদন।