নোয়াখালীতে নিখোঁজের আড়ালে ডাবল মার্ডার!
২০২৪ সালের মার্চ মাস। নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী থানায় জিডি করে সৎ ভাই সাগর দাবি করেছিলেন, তার সৎ মা কমলা খাতুন হঠাৎ নিখোঁজ হয়েছেন। বাইরে থেকে নিখোঁজের সাধারণ গল্প মনে হলেও এর পেছনে লুকিয়ে ছিল এক বীভৎস সত্য। অবশেষে দীর্ঘ দুই বছর পর, এক কোটি টাকা মূল্যের জমি ও লোভের আড়ালে ঢাকা পড়া সেই নৃশংস ডাবল মার্ডারের রহস্য উন্মোচিত হয়েছে। পুকুরপাড়ের মাটির গভীর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে এক হতভাগ্য মা ও তার সন্তানের কঙ্কাল ও দেহাবশেষ। সম্পত্তির লোভে আপন ভাই ও সৎ মাকে শ্বাসরোধ করে পুঁতে রাখার এই রোমহর্ষক ঘটনার অন্দরমহল নিয়ে নাগরিক প্রতিদিন-এর বিশেষ অনুসন্ধান।
ঘটনার শুরু ২০১২ সালে, যখন জীবনের নানা ঝড়ঝাপটা পেরিয়ে ২২ বছর বয়সী বিধবা কমলা খাতুন বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন বিপত্নীক আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে। দু’জনের এই দ্বিতীয় সংসারে জন্ম নেয় একমাত্র পুত্র সন্তান নোমান। আবুল কালাম আজাদের প্রথম পক্ষের সংসারে ছিল আরও তিন ছেলে। বছর সাতেক আগে কালাম আজাদের মৃত্যুর পরও কমলা খাতুন সৎ সন্তানদের নিয়ে একই বাড়িতে শান্তিপূর্ণভাবেই বসবাস করছিলেন। কিন্তু সমস্যা বাঁধে কালাম আজাদের লিখে দেওয়া ৩০ শতাংশ জমি নিয়ে, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় এক কোটি টাকা। কালাম আজাদ মৃত্যুর আগে এই সম্পত্তি দ্বিতীয় স্ত্রী কমলা খাতুন ও ছোট ছেলে নোমানের নামে লিখে দিয়ে যান। এই কোটি টাকার সম্পত্তি নিজেদের নামে লিখে নিতে প্রথম পক্ষের সন্তান জিয়াউর রহমান সাগর প্রবাস থেকে ফিরে সৎ মায়ের ওপর চরম মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন শুরু করেন।
২০২৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতে কমলা খাতুন ও শিশু নোমানকে মারধর করে প্রাণনাশের হুমকি দেয় সৎ সন্তানেরা। এর ঠিক দুদিন পর থেকেই মা-ছেলে চিরতরে নিখোঁজ হয়ে যান। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে বিভ্রান্ত করতে সৎ ছেলে সাগর নিজেই থানায় গিয়ে সৎ মায়ের নিখোঁজের নাটকীয় জিডি করেন। কিন্তু কমলা খাতুনের ছোট বোন রহিমা বেগমের সন্দেহের ভিত্তিতে মামলাটি গড়ায় সিআইডিতে।
সিআইডি অনুসন্ধানে নেমে ভিকটিম কমলা খাতুনের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি উদ্ধার করে ঢাকার এক ব্যক্তির কাছ থেকে। জানা যায়, ফোনটি ঢাকার সবুজবাগ এলাকার একটি বাসা থেকে ভাঙারি মালের সঙ্গে বিক্রি করা হয়েছিল। সিআইডি বিস্তারিত খোঁজ নিয়ে জানতে পারে, ওই বাসাতেই একসময় ভাড়াটিয়া হিসেবে থাকতেন কমলা খাতুনের আরেক সৎ ছেলে সাইফুল ইসলাম রাজন ওরফে রাজু। ব্যস, নিখোঁজের নাটকের পেছনের অপরাধের সুতোটি ধরে ফেলে সিআইডি।
তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় গত ২১ মে ময়মনসিংহের ভাটিকাশর থেকে প্রথমে গ্রেপ্তার করা হয় রাজুকে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ২২ মে নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী থেকে গ্রেপ্তার হন মূলহোতা জিয়াউর রহমান সাগর ও তাদের সহযোগী আশিকুর রহমান টিপু। এরপর রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করতেই বেরিয়ে আসে গা শিউরে ওঠার মতো স্বীকারোক্তি।
আসামিরা স্বীকার করেন, হত্যার ঠিক ১৫ দিন আগে বাড়ির পাশের পুকুরপাড়ে তারা একটি গভীর গর্ত খুঁড়ে রাখে্ন। ২০২৪ সালের ১ মার্চ রাতে কমলা খাতুন ও শিশু নোমানের খাবারের পানির সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দেন তারা। রাতে মা ও সন্তান অচেতন হয়ে পড়লে ঘাতকেরা ঘরে প্রবেশ করে গামছা পেঁচিয়ে, হাত দিয়ে গলা চেপে ও বালিশ চাপা দিয়ে দুজনকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন তারা। অপরাধের প্রমাণ মুছতে মরদেহ দুটির কাপড় খুলে পূর্বপ্রস্তুত গর্তে মাটিচাপা দেওয়া হয় ও পরনের কাপড় আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়।
খুনিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত ২৪ মে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গ্রাম পুলিশের উপস্থিতিতে ভেকু বা এক্সকাভেটর দিয়ে পুকুরপাড় খনন করে সিআইডি। মাটি খুঁড়তেই বেরিয়ে আসে হতভাগ্য মা কমলা খাতুন ও শিশু নোমানের কঙ্কালসার দেহাবশেষ। দীর্ঘ দুই বছর ধরে মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা সেই হাড় ও অবয়ব দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনেরা। দেহাবশেষ ময়নাতদন্তের জন্য নোয়াখালী সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে এবং ডিএনএ পরীক্ষার প্রক্রিয়া চলছে।
সিআইডি জানায়, গ্রেপ্তারকৃত তিন আসামিই আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় নিজেদের লোমহর্ষক অপরাধের কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে।