জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেছেন, ‘এ দেশের মাটিতে শেখ হাসিনার সমাধি কোনোদিন হবে না, ফিরে আসার কোনো সমাদরও হবে না। তার কর্মফলই তার পতনের কারণ।’
বুধবার (২৬ আগস্ট) সন্ধ্যায় রাঙামাটি শহরের রিজার্ভ বাজারে আয়োজিত এনসিপির সাংগঠনিক সমন্বয় সভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন।
সারজিস আলম বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা পরিষদে সবার আগে নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। কোনো রাজনৈতিক দলের স্থানীয় কমিটিতে জেলা পরিষদকে পরিণত করলে সেখানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমেই জেলা পরিষদ পরিচালিত হওয়া উচিত।
পার্বত্য অঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে সারজিস আলম বলেন, তিন জেলায় অন্তত ৫০০ শয্যার পূর্ণাঙ্গ ও বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রয়োজন। প্রত্যন্ত এলাকা থেকে জেলা সদরে চিকিৎসা নিতে আসতে দীর্ঘ সময় লাগে। তাই দুর্গম এলাকার মানুষের ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে প্রতিটি জেলায় আধুনিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা জরুরি।
শিক্ষাব্যবস্থা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের মানুষ মানসম্মত শিক্ষা থেকে পিছিয়ে রয়েছে। প্রত্যেক জেলার স্কুল, কলেজ ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচনা করে সারজিস আলম বলেন, শেখ হাসিনা যেভাবে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন, এরপরও তার ফিরে আসার কথা বলা রাজনৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য। জুলাই আন্দোলনে হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, শেখ হাসিনার শাসনামলের কর্মকাণ্ডের কারণেই জনগণের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
দেশের অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, রাষ্ট্রের সুযোগ-সুবিধা ও সম্পদের বড় একটি অংশ অল্প কিছু মানুষের হাতে কুক্ষিগত হয়েছে। মধ্যস্বত্বভোগী একটি শ্রেণি এর সুবিধা পেলেও দেশের বড় অংশের মানুষ ঋণ-ধার করে সংসার চালাচ্ছে। সন্তানদের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন খরচ মেটাতে অনেক পরিবারকে চরম দুশ্চিন্তার মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘এই সিস্টেমটা ভাঙতে হবে। যদি মনে হয় এটাই সত্য ও বাস্তবতা, তাহলে এই সত্যের জন্য লড়াই করতে হবে। প্রয়োজনে ত্যাগ ও আত্মত্যাগ স্বীকার করতে হবে।’
জুলাই আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে সারজিস আলম বলেন, অনেকে রক্ত দিয়েছেন, অনেকে জীবন দিয়েছেন। তাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে দেশের মানুষ রাজনৈতিক অধিকার ফিরে পেয়েছে এবং স্বাধীনভাবে কথা বলার সুযোগ তৈরি হয়েছে। সেই জায়গা থেকেই নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে এনসিপি পরিবর্তনের রাজনীতি নিয়ে সামনে এসেছে।
বর্তমান সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, বিএনপি দীর্ঘদিন নির্যাতনের শিকার হয়েছে এবং জুলাই আন্দোলনের সহযোদ্ধা হিসেবে তাদের কাছ থেকে জনগণের প্রত্যাশা ছিল—ক্ষমতায় গিয়ে তারা জুলুম, ক্ষমতার অপব্যবহার ও লুটপাটের রাজনীতি করবে না। কিন্তু ক্ষমতায় আসার মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
পার্বত্য জেলা পরিষদ প্রসঙ্গে সারজিস আলম বলেন, জেলা পরিষদগুলো যেভাবে গঠন করা হয়েছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক। পার্বত্য তিন জেলায় জেলা পরিষদের গুরুত্ব অনেক বেশি। এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে, কেউ এমপি হওয়ার পরিবর্তে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হতে চাইবেন এবং কেউ উপজেলা চেয়ারম্যানের পরিবর্তে জেলা পরিষদের সদস্য হওয়ার পদকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করবেন।
তিনি প্রশ্ন করেন, ‘জেলা পরিষদকে যদি কোনো রাজনৈতিক দলের স্থানীয় কমিটিতে পরিণত করা হয়, তাহলে সেখানে কীভাবে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে?’
জেলা পরিষদের সদস্য পদে অর্থের বিনিময়ে নিয়োগের অভিযোগের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কেউ যদি কোটি টাকা খরচ করে একটি পদে আসেন, তাহলে সেই অর্থ তুলে নেওয়ার জন্য দুর্নীতি ও লুটপাটের প্রবণতা তৈরি হবে। এ ধরনের প্রক্রিয়া কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে সারজিস আলম বলেন, বিভিন্ন সময়ে এ অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য বড় বড় বরাদ্দ এলেও প্রত্যন্ত গ্রামের যোগাযোগব্যবস্থা, উন্নত হাসপাতাল ও মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ঘাটতি রয়ে গেছে। জনগণের প্রশ্ন—এত বড় বরাদ্দ কোথায় যাচ্ছে?
তিনি বলেন, ‘আমরা ছোট ছোট স্বার্থ নিয়ে বিভক্ত না হয়ে বড় করে চিন্তা করতে চাই। একজন কৃষক, একজন জেলে কিংবা একজন অধ্যাপক—প্রত্যেকেই যেন নিজের সন্তানকে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে পড়ানোর স্বপ্ন দেখতে পারেন, সেই বাংলাদেশ গড়তে হবে।’
সভায় এনসিপির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।