বিকেলে অন্যরা যখন খেলাধুলায় ব্যস্ত, তখন এক কোণে বসে কোরআন পড়ত মুসাইব হোসাইন। রাতে সহপাঠীরা ঘুমিয়ে পড়লেও থামত না তার তিলাওয়াত। দিনের পর দিন এমন অধ্যবসায়, একাগ্রতা ও পরিশ্রমের পর মাত্র ৭৩ দিনে পুরো কোরআন মুখস্থ করেছে ১৩ বছরের এই কিশোর। এখন সে হাফেজ মুসাইব।
মুসাইব বরিশালের গৌরনদী উপজেলা গেটসংলগ্ন হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রা.) হিফজুল কোরআন মাদ্রাসার হেফজ বিভাগের ছাত্র। তার বাড়ি আগৈলঝাড়া উপজেলার ফুলশ্রী গ্রামে। সে ওই গ্রামের মিজানুর রহমান বেপারীর ছেলে। অল্প সময়ে কোরআন হেফজ হওয়ায় মাদ্রাসার পক্ষ থেকে তাকে সংবর্ধনাও দেওয়া হয়েছে।
মুসাইবের পরিবার ও শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় মেধার স্বাক্ষর রাখছিল সে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের বিভিন্ন মেধা তালিকা ও প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পেয়েছে মুসাইব। পরে পরিবারের সিদ্ধান্তে তাকে হিফজুল কোরআন মাদ্রাসায় ভর্তি করা হয়। সেখানে ভর্তি হওয়ার পর কোরআন মুখস্থ করাকেই নিজের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নেয় সে।
শিক্ষকেরা জানান, নির্ধারিত পড়ার সময়ের বাইরেও নিজের আগ্রহে নিয়মিত কোরআন তিলাওয়াত করত মুসাইব। বিকেলে সহপাঠীরা খেলাধুলা করলেও সে এক পাশে বসে কোরআন পড়ত। রাতে অন্যরা ঘুমিয়ে পড়লেও চালিয়ে যেত তিলাওয়াত। এভাবেই মাত্র ৭৩ দিনে পুরো কোরআন হেফজ করে সে।
মুসাইবের বাবা মিজানুর রহমান বেপারী বলেন, ‘আল্লাহ আমার ছেলেকে মেধা দিয়েছেন। সেই মেধা দ্বীনের কাজে ব্যবহার করতে চাইছিলাম। এ কারণে আলেম-ওলামাদের সঙ্গে পরামর্শ করে তাকে হিফজুল কোরআন মাদ্রাসায় ভর্তি করি। আল্লাহ তাআলা ২ মাস ১৩ দিনের মধ্যেই তাকে হাফেজ হিসেবে কবুল করেছেন। বাবা হিসেবে আমি খুবই গর্বিত। ছেলের জন্য সবার কাছে দোয়া চাই।’
মুসাইবের মক্তব শিক্ষক বলেন, ছোটবেলা থেকেই তার মেধা ও কোরআন শেখার প্রতি আগ্রহ ছিল। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি মক্তবেও সে মনোযোগী ছিল। অল্প সময়ের মধ্যেই কোরআন মুখস্থ করার সক্ষমতা দেখিয়েছে মুসাইব। তার এই সাফল্য আল্লাহর বিশেষ রহমত।
নিজের অর্জনে উচ্ছ্বসিত মুসাইব বলে, ‘সবার দোয়ায় আমি ৭৩ দিনে কোরআনের হাফেজ হয়েছি। বড় হয়ে একজন বড় আলেম হতে চাই। আমার জন্য সবাই দোয়া করবেন।’
মাদ্রাসার মুহতামিম হাফেজ ক্বারী একরামুল হক বলেন, দুই মাস বা কয়েক মাসে কোরআন হেফজ করার কথা বিভিন্ন সময় শুনেছেন তিনি। তবে এত অল্প সময়ে কোনো ছাত্রকে হেফজ করানোর অভিজ্ঞতা তাঁর ছিল না। মুসাইবের মাধ্যমে সেই অভিজ্ঞতা হয়েছে।
তিনি বলেন, অন্য ছাত্ররা বিকেলে খেলাধুলা করলেও মুসাইব এক পাশে বসে কোরআন পড়ত। রাতে ছাত্ররা ঘুমিয়ে পড়লেও সে তিলাওয়াত করত। নিজের আগ্রহ, চেষ্টা ও একাগ্রতার কারণে আল্লাহর রহমতে মাত্র ২ মাস ১৩ দিনে সে কোরআন মুখস্থ করেছে। এমনও দিন গেছে, এক দিনে এক পারা পর্যন্ত মুখস্থ করেছে।
হাফেজ ক্বারী একরামুল হক বলেন, ‘এটা আল্লাহ তাআলার বিশেষ রহমত। আমরা মুসাইবের জন্য দোয়া ছাড়া আর কী-ই বা করতে পারি। দেশবাসীর কাছেও তার জন্য দোয়া চাই।’
মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ জানায়, এর আগেও প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষকদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় শিক্ষার্থীরা দেশের বিভিন্ন কোরআন হেফজ ও কিরাত প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সুনাম অর্জন করেছেন। সেই ধারাবাহিকতায় মুসাইবের এই সাফল্যও মাদ্রাসাটির জন্য বড় অর্জন বলে মনে করছেন শিক্ষক ও অভিভাবকেরা।