ঈদে বাড়ি ফেরার কথা ছিল রমজান আলীর (৩৫)। দীর্ঘ এক যুগ প্রবাস জীবনের ইতি টেনে নববধূকে নিয়ে নতুন ঘরে সুখের সংসার গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। ইরাকে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার চার মাস পর গ্রামের বাড়িতে ফিরলেন কফিনবন্দী হয়ে।
নিহত রমজান আলী জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলার আগপয়লা ঠেঙ্গেপাড়া এলাকার মো. রহিম বাদশার ছেলে। তিন ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন মেঝো।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অসুস্থ বাবার সংসারের হাল ধরতেই প্রায় ১২ বছর আগে জীবিকার সন্ধানে ইরাকে পাড়ি জমান রমজান। দীর্ঘ প্রবাস জীবনে কঠোর পরিশ্রম করে পরিবারের জন্য নির্মাণ করেন একটি বাড়ি। বাবা-মায়ের প্রতি ভালোবাসা থেকে বাড়িটির নাম রাখেন ‘মা-বাবা মঞ্জিল’।
মাত্র আট মাস আগে প্রবাস থেকেই পরিবারের পছন্দে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বিয়ে করেন তিনি। স্বপ্ন ছিল, দেশে ফিরে নববধূকে নিয়ে নতুন জীবনের শুরু করবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন ভেঙে যায় গত ৩ জানুয়ারি।
ইরাকে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান রমজান আলী। এরপর দীর্ঘ চার মাসেও দেশে আনা সম্ভব হয়নি তার মরদেহ। এতে অনিশ্চয়তা ও মানসিক কষ্টে দিন কাটছিল পরিবারের সদস্যদের। পরে জেলা গণঅধিকার পরিষদের সাবেক সহ-সভাপতি আরিফুল ইসলাম তুহিনের সহযোগীতায় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বৃহস্পতিবার (২১ মে) দুপুরে বাড়িতে আসে রমজানের মরদেহ। এসময় সেখানে হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। শেষবারের মতো এক নজর দেখতে বাড়িতে ভিড় করেন স্বজন ও স্থানীয়রা। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
ছেলের মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছেন বাবা মো. রহিম বাদশা। অসুস্থ এই বৃদ্ধ ঠিকমতো কথাও বলতে পারছিলেন না। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেটা সংসারের জন্য বিদেশ গেছিল। আমার অসুখের পর সব দায়িত্ব ও-ই নিছিল। কত কষ্ট করে টাকা পাঠাইছে, বাড়ি করছে। ঈদে বাড়ি আসবো কইছিল..কিন্তু লাশ হয়ে আসবো, এটা কোনোদিন ভাবি নাই। আল্লাহ আমার ছেলেডারে জান্নাত দিক।’
স্থানীয়রা জানান, ছোটবেলা থেকেই রমজান আলী খুব শান্ত, ভদ্র ও পরিশ্রমী ছিলেন। পরিবারের প্রতি তার দায়িত্ববোধ ছিল অনেক বেশি। অসুস্থ বাবার সংসারের হাল ধরতেই অল্প বয়সে বিদেশে পাড়ি জমান তিনি। নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কথা না ভেবে সবসময় পরিবারের কথাই ভাবতেন।
রমজানের প্রতিবেশি সোলায়মান বলেন, ‘রমজান অনেক ভালো ছেলে ছিল। পরিবারের জন্য অনেক কষ্ট করছে। এত সুন্দর বাড়ি করছে, বিয়েও করছে। কিন্তু সেই সুখ আর ভোগ করতে পারল না। এমন মৃত্যু সত্যিই খুব কষ্টের।’
গণঅধিকার পরিষদের নেতা আরিফুল ইসলাম তুহিন বলেন, ‘দীর্ঘদিন মরদেহ দেশে না আসায় পরিবারটি অনেক কষ্টে ছিল। পরে বিষয়টি জানতে পেরে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করি। সবার সহযোগিতায় অবশেষে মরদেহ দেশে আনা সম্ভব হয়েছে।’