রংপুর-সৈয়দপুর মহাসড়কে সংস্কারকাজ শেষ হয়েছিল মাত্র চার মাসে আগে। এরই মধ্যে বিভিন্ন জায়গায় কার্পেটিং উঠে গেছে। গর্ত ও ছোট-বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়ক সংস্কারের কাজটি ছিল দায়সারা ও নিম্নমানের। বড় গর্তগুলোতে সামান্য পাথর ও পিচ দিয়ে নামমাত্র কাজ শেষ করা হয়েছে। ফলে, অল্পসময়ে কার্পেটিং উঠে গর্ত ও ফাটল দেখা দিয়েছে। তারা দ্রুত সময়ের মধ্যে রাস্তাটির সংস্কার দাবি করেন।
অধিকারকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তদারকি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতির কারণে জনগণের করের টাকা নষ্ট হয়েছে। যদিও এর দায় নিতে নারাজ সড়ক বিভাগ। তারা এমন পরিস্থিতির জন্য অতিরিক্ত ওজনের গাড়ি চলাচলকে দায়ী করছে।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রংপুর-সৈয়দপুর মহাসড়কের রংপুর মেডিকেল মোড় থেকে পাগলাপীর বাজার, তারাগঞ্জের শলেয়াশাহ বাজার থেকে বরাতি সেতু, তারাগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে তারাগঞ্জ সেতু ও তারাগঞ্জ বাজার থেকে চিকলি বাজার পর্যন্ত সড়কের ১৭ কিলোমিটার অংশ ডিবিএসটিসহ (ডাবল বিটুমিনাস সারফেস ট্রিটমেন্ট) সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
২০২৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ২৬ কোটি ৮৯ লাখ ৫৯ হাজার ৯৪৬ টাকার কাজটি পায় রাজশাহীর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ডন এন্টারপ্রাইজ। গত বছরের নভেম্বরে কাজ শেষ করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু চার মাস না যেতেই সড়কে বিভিন্ন স্থানে কার্পেটিং উঠে ফাটল ও গর্ত সৃষ্টি হয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, পাগলাপীর থেকে মেডিকেল মোড় পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন স্থানে কার্পেটিং উঠে গিয়ে ছোট-বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। কোথাও ফাটল, আবার কোথাও উঁচু-নিচু অবস্থার কারণে পানি জমে থাকছে, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
সিটির মোড় এলাকার বাসিন্দা আমজাদ হোসেন বলেন, ‘সড়ক ও জনপদের কাজ শুধু সরকারের টাকা মেরে দেওয়া। এই সড়কে বড় বড় গর্ত ছিল। সেগুলো তুলে নামমাত্র পাথর আর পিচ দিয়ে সংস্কার করেছে। এ কারণে কার্পেটিং উঠে গর্ত তৈরি হচ্ছে। বর্ষা এলে আবারও আগের মতো বড় বড় গর্ত তৈরি হবে। যে সংস্কার করছে তা ওই জলে ধুয়ে-মুছে যাবে।’
পাগলাপীরের ব্যবসায়ী শাহিন মিয়া বলেন, ‘সড়কের কাজ শেষ হতে না হতেই আবার খারাপ হয়ে যায়। এসব দায়সারা কাজ করে মানুষকে বোঝানো হয়। এর আগে সংস্কার করার সময় সেনাবাহিনী হাতেনাতে ভুল ধরেছিল। তবুও সংস্কার কাজ ভালো হয়নি।’
জানা গেছে, এই রাস্তাটির সংস্কার কাজ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ নতুন নয়। গত বছরের ২৩ জুলাই সেনাবাহিনীর একটি টহল দল কাজের সময় অনিয়ম শনাক্ত করে। অভিযোগ রয়েছে, ১০ কিলোমিটার সড়কে প্রায় ৩৬৫ টন পাথর কম ব্যবহার করা হয়েছে। এ ছাড়া নিম্নমানের বিটুমিন ব্যবহার করা হয়েছে।
তবে সড়কের এমন অবস্থার জন্য অতিরিক্ত ওজনের যানবাহনকেও দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। গত সোমবার সিটির মোড়ে সংস্কারের সময় সওজের সংস্কারকাজের গাড়ি চালক সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘এই রোডে ৮০-১০০ টনের গাড়ি চলে। এই ওভার লোডেড গাড়ি চললে সড়ক কোনো দিন ঠিক থাকবে না, গর্ত আর ফাটল ধরবে। ৮০ টন, ১০০ টন ওজনের গাড়ি চললে অফিস কি করবে।’
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) জেলা সভাপতি খন্দকার ফখরুল আনাম বেন্জু বলেন, সড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে নিয়ম আছে। এই নিয়ম কতটুকু পালন করা হচ্ছে সেটি দেখভাল করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রকৌশলীদের। বিটুমিন কোয়ালিটি অনুযায়ী দেওয়া হচ্ছে কি না, কার্পেটিং ম্যানুয়াল অনুযায়ী করা হচ্ছে কি না, সেটিও দেখার দায়িত্ব তাদের। অল্পসময়ে একই রাস্তা বারবার মেরামত করা হচ্ছে। এতে জনগণের করের টাকা ব্যয় হচ্ছে। রংপুর-সৈয়দপুর সড়কটির বর্তমান অবস্থা অবহেলার কারণে হয়েছে।
রংপুর সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘কিছু কিছু জায়গায় বেইজ প্রবলেম ছিল। সেভাবেই ট্রিটমেন্ট দেওয়া হয়েছে। যদিও বেইস তুলে ফেলে কার্পেটিং করার দরকার ছিল। আমরা সেটি করতে পারিনি। অতি দ্রুত একটি প্রজেক্ট নিয়ে রাস্তার কাজ পুনরায় শুরু করা হবে। বাংলাদেশের সব জায়গার রাস্তা ওভারলোডিংয়ের কারণে দ্রুত নষ্ট হয়। চাইলেও ওভারলোডিং কন্ট্রোল করা যাচ্ছে না।’