বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব, বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ইন্তেকাল করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।
খালেদা জিয়ার মৃত্যু শুধু দেশেই নয়—বিশ্ব গণমাধ্যমেও গভীর গুরুত্বের সঙ্গে প্রচারিত হচ্ছে। তার মৃত্যুর খবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো দ্রুত ‘ব্রেকিং নিউজ’ হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছে। বিশ্বের প্রভাবশালী সংবাদ সংস্থা ও গণমাধ্যমগুলো তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, নেতৃত্ব ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার প্রভাব তুলে ধরে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
এএফপি
বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া মঙ্গলবার সকালে ইন্তেকাল করেন। বিএনপির পক্ষ থেকে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আজ সকাল ৬টায় ফজরের নামাজের পর ইন্তেকাল করেছেন। আমরা তার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি এবং দেশবাসীর কাছে দোয়া প্রার্থনা করছি।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)
এপি তাদের প্রতিবেদনে জানায়, দীর্ঘদিন অসুস্থতার পাশাপাশি আইনি লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে গেছেন বেগম খালেদা জিয়া। তার বিরুদ্ধে আনা মামলাগুলোকে তিনি ও তার দল বরাবরই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছিল।
এপির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্ট তাকে সর্বশেষ দুর্নীতি মামলা থেকে খালাস দেয়। এতে করে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পথে তার সব আইনি বাধা দূর হয়েছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগের সরকারের সময় একাধিকবার তার বিদেশে চিকিৎসার আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলেও অন্তর্বর্তী সরকার চলতি বছরের জানুয়ারিতে তাঁকে বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি দেয়। উন্নত চিকিৎসা শেষে তিনি মে মাসে যুক্তরাজ্য থেকে দেশে ফেরেন।
আল জাজিরা
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানায়, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি লিভার সিরোসিস, ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস, হৃদরোগসহ বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। গত ২৩ নভেম্বর ফুসফুসের সংক্রমণ ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে নিউমোনিয়াসহ শারীরিক জটিলতা বেড়ে গেলে তাকে সিসিইউ ও আইসিইউতে রাখা হয়। দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে তার চিকিৎসা চলছিল।
রয়টার্স
ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্স তাদের প্রতিবেদনে খালেদা জিয়ার মৃত্যুকে “বাংলাদেশের রাজনীতির এক প্রভাবশালী অধ্যায়ের সমাপ্তি” বলে উল্লেখ করেছে। তারা তার সঙ্গে শেখ হাসিনার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বৈরিতা, সেনাশাসনবিরোধী আন্দোলনে তার দৃঢ় ভূমিকা এবং দুই দশকের বেশি সময় ধরে দেশের ক্ষমতার রাজনীতিকে প্রভাবিত করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছে।
বিবিসি
বিবিসি তাদের প্রতিবেদনে জানায়, দীর্ঘ অসুস্থতার পর ৮০ বছর বয়সে বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া মারা গেছেন। বিবিসির বিশ্লেষণে তাঁর শাসনামল, রাজনৈতিক বিতর্ক, কারাবরণ এবং অসুস্থ অবস্থায় দীর্ঘ চিকিৎসার বিষয়গুলো আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে।
এছাড়াও দ্য ডন, এনডিটিভি ও দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া—সবকটি গণমাধ্যমই খালেদা জিয়ার মৃত্যুকে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে একটি বড় ঘটনা হিসেবে তুলে ধরেছে। এসব প্রতিবেদনে তাকে শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম শক্তিশালী হিসেবেই চিহ্নিত করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কাভারেজ বলছে—বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নেত্রীর বিদায় নয়, এটি বাংলাদেশের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান, যা বিশ্বও গুরুত্ব দিয়ে প্রত্যক্ষ করছে।
বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনসহ সারাদেশে এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতাল, গুলশানে তার বাসভবন ও নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে শোকাহত নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের ভিড় দেখা গেছে।
দীর্ঘ চার দশকের রাজনৈতিক জীবনে আপসহীন নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে পরিচিত এই নেত্রীর প্রয়াণে দেশ-বিদেশে অসংখ্য মানুষ শোক প্রকাশ করছেন।