হারিয়ে যাওয়া ছাগল খুঁজতে বেরিয়েছিলেন কেনিয়ার পশ্চিমাঞ্চলের রাখাল মানাসে লোমাচার। কিন্তু ছাগলের বদলে তার ভাগ্যে জুটল সোনা। নদীর তীরে কয়েকজন নারীকে সোনা খুঁজতে দেখে তাদের সঙ্গে যোগ দেন ৩৩ বছর বয়সী লোমাচার। সেখানেই তিনি প্রায় ৩ গ্রাম সোনা পান। পরে সেই সোনা বিক্রি করে পান ৩৬ হাজার কেনিয়ান শিলিং, যা প্রায় ২৮০ মার্কিন ডলারের সমান। সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন তথ্য।
প্রতিবেদনে বলা হয়, লোমাচারের এই ছোট্ট আবিষ্কারের খবর ছড়িয়ে পড়তেই কেনিয়ার প্রত্যন্ত চেপোরোর গ্রামটি পরিণত হয় আকস্মিক ‘গোল্ড রাশ’-এর কেন্দ্রে। স্থানীয় কর্মকর্তাদের হিসাবে, সোনার সন্ধানে একপর্যায়ে সেখানে প্রায় ১০ হাজার মানুষ জড়ো হন। তারা মাটি খুঁড়ে এবং নদীর তলদেশে অনুসন্ধান চালিয়ে মূল্যবান ধাতুটির সন্ধান করছেন।
হারানো ছাগল থেকে সোনার সন্ধান
লোমাচার বিবিসিকে জানান, হারিয়ে যাওয়া ছাগল খুঁজতে গিয়ে তিনি স্থানীয় নদীর তীরে একদল নারীকে সোনা সংগ্রহ করতে দেখেন। পরে তাদের সঙ্গে যোগ দিয়ে তিনিও সোনা খুঁজতে শুরু করেন।
একপর্যায়ে প্রায় ৩ গ্রাম সোনা পান তিনি। সেটি ৩৬ হাজার কেনিয়ান শিলিংয়ে বিক্রি করার পর খবরটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এতে স্থানীয় মানুষের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়, ওই এলাকায় হয়তো আরও বিপুল পরিমাণ সোনা রয়েছে।
তবে স্থানীয় কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু লোমাচারের পাওয়া সোনাই সেখানে মানুষের ঢল নামার একমাত্র কারণ নয়।
ওয়েস্ট পোকট কাউন্টির ডেপুটি কমিশনার স্যামুয়েল কিয়ারি বিবিসিকে জানান, প্রথমে কয়েকজন তরুণ বড় ধরনের সোনার সন্ধান পান বলে খবর ছড়ায়। এরপর একই এলাকায় কয়েকজন নারীরও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সোনা পাওয়ার কথা জানা যায়। পরে মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া গুজবে এসব আবিষ্কারের পরিমাণ আরও বাড়িয়ে বলা হয়।
ভাগ্য বদলের আশায় হাজারো মানুষ
লোমাচারের মতো ভাগ্য বদলের আশায় কেনিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল এমনকি প্রতিবেশী উগান্ডা থেকেও মানুষ চেপোরোরে ছুটে আসছেন।
কেউ কোদাল ও শাবল দিয়ে শক্ত মাটি খুঁড়ছেন, আবার কেউ মাটি তুলে নদীর তীরে নিয়ে বাটিতে পানি দিয়ে ধুয়ে সোনার ক্ষুদ্র কণা খুঁজছেন। অভিজ্ঞ খনিশ্রমিকেরা আরও গভীরে গর্ত করছেন এবং পাথরের স্তরে ড্রিলও করছেন।
অনুসন্ধানকারীদের অনেকের কাছেই সামান্য সোনা পাওয়া মানে বড় ধরনের স্বস্তি।
কাছের একটি গ্রামের কৃষক ও পশুপালক প্যাট্রিক লোকোলিয়া জানান, সন্তানদের স্কুলের খরচ চালাতে হিমশিম খাওয়ায় তিনি সোনা খুঁজতে এসেছেন। ১৮ বছর বয়সী অ্যাবিগেইল চেলেঙ্গাতও সেখানে এসেছেন একই আশায়। সোনা পেলে নিজের পড়াশোনার খরচের পাশাপাশি ছোট ভাই-বোনদেরও সহায়তা করতে পারবেন বলে আশা করছেন তিনি।
চেপোরোর এলাকায় অবশ্য এর আগেও সোনা পাওয়া গেছে। স্থানীয় নারীরা কয়েক বছর ধরে নদীর তীরে সোনা সংগ্রহ করছিলেন। তবে সাধারণত সপ্তাহে তাদের আয় হতো মাত্র ৮ থেকে ২৩ ডলারের মতো। চলতি মাসের শুরুতে তুলনামূলক বড় কয়েকটি সোনা পাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পরই সেখানে ব্যাপক মানুষের সমাগম শুরু হয়।
মাটির নিচে আসলে কত সোনা, জানেন না কেউ
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—চেপোরোরে আদৌ এত পরিমাণ সোনা আছে কি না, যা বড় আকারের খনির কার্যক্রম পরিচালনার জন্য যথেষ্ট।
কর্মকর্তারা অল্প পরিমাণ সোনা পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করলেও ভূগর্ভে মোট কত সোনার মজুত রয়েছে কিংবা তা বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলন করা সম্ভব কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত নন। এখন পর্যন্ত পাওয়া সোনার মূল্য কয়েকশ কেনিয়ান শিলিং থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ প্রায় ৭৮ হাজার শিলিং বা ৬০০ ডলার পর্যন্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।
ইতোমধ্যে কয়েক ট্রাক মাটি ও পাথর কাছের অরটুম এলাকায় প্রক্রিয়াজাত করার জন্য পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে পাওয়া ফলাফলের অপেক্ষায় রয়েছেন কর্মকর্তারা।
ডেপুটি কমিশনার কিয়ারি বলেন, শুরুর দিকের সোনা পাওয়ার ঘটনাগুলো নিয়ে নানা অতিরঞ্জিত তথ্য ছড়িয়ে পড়ায় এই ‘গোল্ড রাশ’ আরও তীব্র হয়েছে। এর ফলে খননকাজ সম্পর্কে কোনো অভিজ্ঞতা নেই—এমন অনেক মানুষও সেখানে ছুটে আসেন। পরে সোনা না পেয়ে তাদের অনেকে আবার ফিরে গেছেন।
সোনার খনিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে নতুন জনপদ
সোনার সন্ধানে মানুষের ঢল শুধু ওই এলাকার মাটির চেহারাই বদলায়নি, বদলে দিয়েছে পুরো জনজীবনও।
স্থানীয় কর্মকর্তারা জানান, হঠাৎ করে মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় খনি এলাকার আশপাশে এরই মধ্যে ২০০টির বেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। খনিশ্রমিক ও দর্শনার্থীদের জন্য পানি, খাবার, রুটি, দুধসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা।
তবে বিপুল মানুষের আগমনে প্রত্যন্ত এলাকাটির অবকাঠামোগত দুর্বলতাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সেখানে পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা নেই। স্যানিটেশন ব্যবস্থাও সীমিত। বাইরে থেকে আসা অনেক মানুষের থাকার জন্যও পর্যাপ্ত জায়গা নেই।
প্রতিবেশী বারিঙ্গো কাউন্টি থেকে খাবার ও পানীয় বিক্রি করতে আসা আইরিন আমেজা বিবিসিকে বলেন, সেখানে পান ও গোসলের জন্য পরিষ্কার পানির সংকট রয়েছে। একই সঙ্গে রাত কাটাতে আসা নারীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। কারণ অস্থায়ীভাবে অবস্থান নেওয়া অধিকাংশ মানুষই পুরুষ।
নিরাপত্তা পরিস্থিতি, রোগের বিস্তার ও স্যানিটেশন নিয়ে উদ্বেগের কারণে কর্তৃপক্ষ সেখানে টহল বাড়িয়েছে এবং জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তাদেরও মোতায়েন করেছে। নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হলে শিশুরাও যাতে স্কুলে না গিয়ে খননকাজে জড়িয়ে না পড়ে, তা নিয়েও উদ্বিগ্ন কর্মকর্তারা।
এদিকে, এই আকস্মিক সোনার সন্ধানকে নিজেদের এলাকার দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের সুযোগ হিসেবে দেখছেন লোমাচার।
তিনি বিবিসিকে বলেন, স্থানীয় খনিশ্রমিকদের আরও নিরাপদ ও আধুনিক পদ্ধতিতে খনিজ অনুসন্ধানের সুযোগ করে দিতে সরকারের সহায়তা করা উচিত। এর মধ্যে মেটাল ডিটেক্টরের মতো সরঞ্জাম ব্যবহারের ব্যবস্থাও থাকতে পারে।
ছনের ছাউনি দেওয়া ঘর যেখানে এখনো অনেক পরিবারের বাস্তবতা, সেই চেপোরোরের মানুষের জীবন যেন এই আকস্মিক সোনার জোয়ারে স্থায়ীভাবে বদলে যায়—এমনটাই প্রত্যাশা লোমাচারের। তিনি চান, সোনার খোঁজে তৈরি হওয়া এই উন্মাদনা যেন ক্ষণস্থায়ী হয়ে হারিয়ে না যায়, বরং তা যেন স্থানীয় মানুষের জীবনমান উন্নয়নের পথ তৈরি করে।