ভারতের গুজরাট থেকে দিল্লি পর্যন্ত বিস্তৃত ১ হাজার ৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ আরাবল্লী পর্বতশ্রেণি মানচিত্রের কেবল কয়েকটি পাথরের সমষ্টি নয়, উত্তর ভারতের কোটি কোটি মানুষের অস্তিত্বের জীবনরেখা। বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন এই পর্বতশ্রেণি যুগ যুগ ধরে থর মরুভূমির আগ্রাসন থেকে উত্তর ভারতের উর্বর সমভূমিকে রক্ষা করে আসছে। কিন্তু অবৈধ খনন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং বন উজাড়ের ফলে আজ ভারতের ভূ-প্রকৃতির এই মেরুদণ্ড নিজেই ক্ষতবিক্ষত। এই জরুরি অবস্থায় আরাবল্লীকে বাঁচাতে কেবল রৈখিক ‘গ্রিন ওয়াল’ নয়, প্রয়োজন সামগ্রিক ‘আরাবল্লী সার্কেল জোন’।
কেন আরাবল্লী উত্তর ভারতের জীবনরেখা?
এই ভূতাত্ত্বিক বিস্ময়ের গুরুত্ব কেবল পাহাড়ের সৌন্দর্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি পুরো অঞ্চলের বেঁচে থাকার মূল চাবিকাঠি:
জলবায়ু নিয়ন্ত্রক ও প্রাচীর: আরাবল্লী একটি প্রাকৃতিক প্রাচীর হিসেবে কাজ করে, যা রাজস্থানের বিধ্বংসী বালুঝড় ও মরুকরণকে পূর্ব দিকে ছড়াতে বাধা দেয়। পাশাপাশি এটি মৌসুমী বায়ুকে নিয়ন্ত্রণ করে উত্তর ভারতে সময়মতো বৃষ্টিপাত নিশ্চিত করে।
নদী ও পানির উৎস: এই পাহাড়গুলো বৃষ্টির পানি ধরে রেখে ভূগর্ভস্থ জলস্তরকে পুনরুজ্জীবিত করে। বানাস, লুনি, সখী এবং সবরমতীর মতো গুরুত্বপূর্ণ নদীর জন্ম এই আরাবল্লী থেকেই।
সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য ও ইতিহাস: চিতাবাঘ, হায়েনা এবং বিভিন্ন বিরল প্রজাতির পাখির নিরাপদ আশ্রয়স্থল এই অঞ্চল। ঐতিহাসিকভাবেও কুম্ভলগড় এবং চিতোরগড়ের মতো দুর্ভেদ্য দুর্গ গড়ে উঠেছিল এই পর্বতের বুকেই।

‘গ্রিন ওয়াল’ বনাম ‘সার্কেল জোন’: চিন্তাধারার পরিবর্তন
আরাবল্লীর ক্ষয় রোধে এবং মরুকরণ ঠেকাতে গুজরাট থেকে দিল্লি পর্যন্ত ১ হাজার ৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘গ্রিন ওয়াল’ বা সবুজ প্রাচীর প্রকল্পের প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে পরিবেশবিদ ও গবেষকদের মতে, কেবল একটি রৈখিক প্রাচীর এই সংকট মোকাবেলায় যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন ‘সার্কেল জোন’ বা বৃত্তীয় অঞ্চলের ধারণা আরাবল্লী কোনো একক সীমারেখা নয়, এটি একটি জটিল জালের মতো। উপত্যকা, জলাধার এবং বন্যপ্রাণীর করিডোরগুলো যদি ভেতর থেকে ফাঁপা ও ধ্বংস হয়ে যায়, তবে কেবল পাহাড়ের কিনারায় গাছ লাগিয়ে কোনো লাভ হবে না। সার্কেল জোন ধারণার মূল কথাই হলো—পুরো বাস্তুতন্ত্রকে একটি অবিচ্ছিন্ন অভয়ারণ্য হিসেবে সুরক্ষা দেওয়া।
বিশেষজ্ঞের সতর্কতা: এখন রক্ষা করার পালা
রাজস্থান কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও রিমোট সেন্সিং বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক লক্ষ্মীকান্ত শর্মা এই বিষয়ে গভীর সতর্কতার কথা জানিয়েছেন। জীববৈচিত্র্য মূল্যায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন পর্যবেক্ষণে অভিজ্ঞ এই অধ্যাপকের মতে, আরাবল্লীকে কেবল ‘সম্পদ আহরণের স্থান’ হিসেবে দেখা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। আমাদের দৃষ্টিকে একটি সাধারণ প্রাচীর থেকে সরিয়ে সমগ্র পরিমণ্ডলের সুরক্ষায় নিবদ্ধ করতে হবে।
হাজার হাজার বছর ধরে এই প্রাচীন পর্বতশৃঙ্গ আমাদের রক্ষা করেছে, এখন সময় এসেছে আমাদের প্রতিদান দেওয়ার। পাথর দিয়ে নয়, বরং গাছের শিকড়, সহনশীলতা এবং প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা দিয়ে এই ভূমিকে বাঁচাতে হবে। আরাবল্লী সুরক্ষিত না থাকলে উত্তর ভারতের লাখ লাখ মানুষের জল ও খাদ্য সরবরাহ পুরোপুরি ভেঙে পড়বে, যা ভবিষ্যতে এক ভয়াবহ মানবিক ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের জন্ম দেবে।