ভারতের মুম্বাইয়ে তাজিয়া মিছিলে বিষাক্ত ক্যাপসুল বিতরণের অভিযোগে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সময়মতো তাকে আটক করায় বড় ধরনের প্রাণহানি এড়ানো গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
মুম্বাইয়ের বাইকুল্লা এলাকায় গত শুক্রবার তাজিয়া মিছিল থেকে ফায়াজ প্রেমজি নামের ওই ব্যক্তিকে আটক করা হয়।
আটকের আগে তার বিতরণ করা ক্যাপসুল সেবনে অন্তত ১১ জন অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে পরীক্ষায় দেখা যায়, ক্যাপসুলগুলোতে জিঙ্ক ফসফাইড ছিল। এটি ইঁদুর মারার বিষসহ বিভিন্ন কীটনাশকে ব্যবহৃত অত্যন্ত বিষাক্ত রাসায়নিক যৌগ।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে ফায়াজ স্বীকার করেন, মহররমের দিন তিনি হাজার হাজার মানুষকে বিষপ্রয়োগ করে হত্যা করতে চেয়েছিলেন।
গতকাল শনিবার রাতে আদালত তাকে দুই দিনের পুলিশি হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন বলে জানিয়েছে এনডিটিভি।
মিছিলে বিষাক্ত ক্যাপসুল বিতরণ
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, শুক্রবার মুম্বাইয়ের বাইকুল্লার রে রোড এলাকার রেহমতাবাদ কবরস্থানের কাছে আশুরার শোক মিছিলে অংশ নেওয়া মানুষের মধ্যে ক্যাপসুল বিতরণ করছিলেন ফায়াজ।
ভিড়ের সুযোগ নিয়ে তিনি সেগুলোকে ব্যথানাশক ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর ওষুধ বলে মানুষের হাতে তুলে দেন।
সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ১১ জন ব্যক্তি ওই ক্যাপসুল খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। বর্তমানে সবাই শঙ্কামুক্ত।
আক্রান্তদের একজন সালমান সাইদ জানান, ক্যাপসুলটি খাওয়ার পর তার তীব্র পেটব্যথা ও বমি শুরু হয়।
মুম্বাই পুলিশের উপকমিশনার জয়ন্ত মীনা জানান, অভিযুক্ত ব্যক্তি ক্যাপসুলের ভেতরে জিঙ্ক ফসফাইড মিশিয়েছিলেন। এ ধরনের ক্যাপসুল বিতরণের অনুমতি তার ছিল না। তল্লাশি চালিয়ে পুলিশ তার কাছে থাকা প্রায় ১৪ হাজার ৯০০ ক্যাপসুল জব্দ করে।
পুলিশ কর্মকর্তা জয়ন্ত জানান, ৩০ হাজার খালি ক্যাপসুল এবং ৫০ কেজি ফসফরাসেরও অর্ডার দিয়েছিলেন ফায়াজ।
যেভাবে এড়ানো গেল বড় দুর্ঘটনা
পুলিশের মতে, তিনজন নারী স্বেচ্ছাসেবকের তৎপরতায় ঘটনার দিন হাজারো মানুষের জীবন রক্ষা পায়। মিছিলে তাদের একজন প্রথমে লক্ষ্য করেন, ফায়াজ সন্দেহজনকভাবে মানুষের মধ্যে ক্যাপসুল বিতরণ করছেন। স্বেচ্ছাসেবকেরা তাকে বাধা দেন এবং পুলিশকে খবর দেন।
একই সঙ্গে লাউডস্পিকারে ঘোষণা দিয়ে সবাইকে ওই ক্যাপসুল না খাওয়ার অনুরোধ করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদের সময় ফায়াজ দাবি করেন, ক্যাপসুলগুলো রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
তখন স্বেচ্ছাসেবকেরা একটি ক্যাপসুল খুলে ভেতরে গুঁড়া জাতীয় পদার্থ দেখতে পান। এতে তাদের সন্দেহ আরও বাড়ে এবং পুলিশকে বিষয়টি জানান।
এরপর ঘটনাস্থলেই ফায়াজকে আটক করা হয় এবং তার কাছে থাকা সব ক্যাপসুল জব্দ করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, ক্যাপসুলগুলো ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।
‘১৫ হাজার মানুষকে হত্যা করতে চেয়েছিলাম’
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে ফায়াজ স্বীকার করেন, শোক মিছিলে অংশ নেওয়া হাজার হাজার মানুষকে হত্যাই ছিল তার উদ্দেশ্য। আটক হওয়ার পর তিনি পুলিশকে বলেন, ‘আমি অন্তত ১৫ হাজার মানুষকে হত্যা করতে চেয়েছিলাম।’
পুলিশ জানিয়েছে, ফায়াজ ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতক। আটকের পর তার বিদেশ সফরের তথ্যও সামনে আসে।
এক জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা জানান, এর আগে তিনি ইরান ও ইরাক সফর করেছিলেন।
বাইকুল্লা থানায় তার বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২৩ ধারায় মামলা করা হয়েছে। এ ধারায় বিষ বা অনুরূপ ক্ষতিকর পদার্থ ব্যবহার করে অপরাধ সংঘটনের উদ্দেশ্যে ক্ষতি করার অভিযোগের বিধান রয়েছে।
জিঙ্ক ফসফাইড কতটা বিপজ্জনক
জিঙ্ক ফসফাইড অত্যন্ত বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ। এটি শরীরে প্রবেশ করলে পাকস্থলীর অ্যাসিডের সঙ্গে বিক্রিয়া করে ফসফিন গ্যাস তৈরি করে।
এই গ্যাস মানবদেহের জন্য অত্যন্ত প্রাণঘাতী। এটি হৃদ্যন্ত্র, ফুসফুস, যকৃৎ, কিডনি ও মস্তিষ্কের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, জিঙ্ক ফসফাইড বিষক্রিয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষেধক নেই।
এ ধরনের বিষক্রিয়ার ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়াই একমাত্র উপায়; যেখানে লক্ষণের ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসা এবং ভেন্টিলেটরের মাধ্যমে জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করা হয়।