মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে একটি বিরল ঘটনা ঘটে গেল। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানবিরোধী সামরিক অভিযানের ওপর লাগাম টানতে একটি ওয়ার পাওয়ারস রেজল্যুশন বা যুদ্ধক্ষমতা সংক্রান্ত প্রস্তাব পাস হয়েছে। এতে রিপাবলিকান দলের চারজন সদস্যও ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে ভোট দিয়েছেন। ফলাফল: ২১৫ বনাম ২০৮। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ভোট কি সত্যিই ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ থামিয়ে দিতে পারবে কিনা। সংক্ষিপ্ত উত্তর, সম্ভবত না। তবে এটি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আল জাজিরার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রতিনিধি পরিষদের এই ভোট মূলত ট্রাম্পের জন্য একটি শক্ত বার্তা। এতে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালাতে হলে কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী যুদ্ধ ঘোষণা বা দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযানের অনুমতি দেওয়ার ক্ষমতা মূলত কংগ্রেসের হাতে। সমালোচকদের অভিযোগ, ট্রাম্প সেই সাংবিধানিক প্রক্রিয়া এড়িয়ে গেছেন।
বর্তমান সংঘাত শুরু হয়েছিল ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মিলে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলা শুরু করে। ট্রাম্প প্রশাসন এটিকে সীমিত অভিযান হিসেবে বর্ণনা করলেও যুদ্ধ ইতোমধ্যে প্রায় ১০০ দিনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
এই প্রস্তাবের ভিত্তি হলো ১৯৭৩ সালের ওয়ার পাওয়ারস অ্যাক্ট। ভিয়েতনাম যুদ্ধের অভিজ্ঞতার পর এই আইন করা হয়েছিল, যাতে কোনো প্রেসিডেন্ট কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া দীর্ঘ সময় যুদ্ধ চালিয়ে যেতে না পারেন। আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কংগ্রেসের অনুমোদন না পেলে সামরিক অভিযান বন্ধ করার কথা। তবে বাস্তবতা অনেক জটিল।
প্রথমত, প্রতিনিধি পরিষদে পাস হওয়া মানেই আইন হয়ে যাওয়া নয়। এখন এটি সিনেটে যেতে হবে। সেখানে পাস হলেও ট্রাম্প ভেটো দিতে পারেন। আর ভেটো অতিক্রম করতে কংগ্রেসের দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন, যা বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় অত্যন্ত কঠিন।
দ্বিতীয়ত, হোয়াইট হাউস আগেই দাবি করেছে, ইরানের সঙ্গে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে। ফলে প্রশাসনের যুক্তি হলো, বর্তমান পরিস্থিতি ‘পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ’ নয় এবং তাই ওয়ার পাওয়ারস আইনের কিছু বিধান প্রযোজ্য নয়।
তাহলে এই ভোটের গুরুত্ব কোথায়?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এর সবচেয়ে বড় তাৎপর্য রিপাবলিকান শিবিরের ভেতরের অস্বস্তি প্রকাশ্যে চলে আসা। ট্রাম্পের নিজের দলের কয়েকজন সদস্য প্রকাশ্যে বলেছেন, যুদ্ধ ঘোষণা করার সাংবিধানিক ক্ষমতা কংগ্রেসের, প্রেসিডেন্টের নয়। বিশেষ করে যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের আশঙ্কা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
এটিও উল্লেখযোগ্য, চলতি বছর ট্রাম্পের ইরাননীতির বিরুদ্ধে প্রতিনিধি পরিষদে এটি চতুর্থ বড় উদ্যোগ। আগের কয়েকটি প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলেও এবার সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া গেছে। ফলে বিষয়টি কেবল প্রতীকী প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ নেই; বরং কংগ্রেস ও হোয়াইট হাউসের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্বের নতুন অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে।
ডেমোক্র্যাটরা এখন সিনেটের ওপর চাপ বাড়াচ্ছেন। তাদের বক্তব্য, ইরান যুদ্ধ শুধু সাংবিধানিক প্রশ্ন নয়, এটি অর্থনৈতিক ও মানবিক প্রশ্নও। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে ঠেকাতে এই সামরিক চাপ প্রয়োজন।
ফলে বাস্তব চিত্র হলো—প্রতিনিধি পরিষদের ভোটের পর যুদ্ধ তাৎক্ষণিকভাবে থেমে যাচ্ছে না। মার্কিন সেনাও এখনই প্রত্যাহার হচ্ছে না। কিন্তু ওয়াশিংটনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পৌঁছে গেছে: ট্রাম্পের ইরাননীতি নিয়ে প্রশ্ন শুধু বিরোধী শিবিরেই নয়, তার নিজের দলেও উঠতে শুরু করেছে। রাজনীতির ভাষায় হয়তো এটিই এই ভোটের সবচেয়ে বড় অর্জন।
সূত্র: আল জাজিরা, রয়টার্স, দ্য গার্ডিয়ান