১৯৩৯ সালে ইংল্যান্ডের সাফোক অঞ্চলের শান্ত গ্রাম সাটন হুতে শুরু হয়েছিল এক সাধারণ প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজ। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সেটি রূপ নেয় ব্রিটিশ ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারগুলোর একটিতে। মাটির নিচ থেকে বেরিয়ে আসে প্রায় ৮০ ফুট লম্বা একটি অ্যাংলো-স্যাক্সন জাহাজের ধ্বংসাবশেষ, যার ভেতরে লুকিয়ে ছিল স্বর্ণালংকার, অস্ত্র, রুপার পাত্র, মুদ্রা এবং অসংখ্য মূল্যবান নিদর্শন। এই আবিষ্কার বদলে দেয় মধ্যযুগের শুরুর দিকের ব্রিটেন সম্পর্কে মানুষের ধারণা।
খননকাজের নেতৃত্বে ছিলেন স্বশিক্ষিত প্রত্নতত্ত্ববিদ বাসিল ব্রাউন। জমির মালিক এডিথ প্রিটি তার এস্টেটের বিশাল মাটির ঢিবিগুলো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই কৌতূহলী ছিলেন। তার অনুরোধেই শুরু হয় খনন। প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল, এগুলো হয়তো সাধারণ কবরস্থান। কিন্তু ধীরে ধীরে মাটির নিচে দেখা যায় লোহার পেরেকের সারি ও কাঠের চিহ্ন। পরে বোঝা যায়, এটি একটি বিশাল জাহাজের অবয়ব। যদিও কাঠ পচে গিয়েছিল, তবু তার ছাপ ও কাঠামো স্পষ্টভাবে রয়ে যায়।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় ছিল জাহাজটির ভেতরের ধনসম্পদ। সেখানে পাওয়া যায় সোনার বেল্ট, অলংকার, তলোয়ার, ঢাল, বিখ্যাত অ্যাংলো-স্যাক্সন হেলমেট এবং বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য থেকে আসা রুপার সামগ্রী। এসব নিদর্শন প্রমাণ করে যে, সেই সময়কার ইংল্যান্ড মোটেও অন্ধকার যুগ ছিল না; বরং তাদের ছিল উন্নত শিল্প, বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ। ইতিহাসবিদরা বলছেন, এই আবিষ্কারই প্রথম শক্তভাবে দেখায় যে সপ্তম শতকের ব্রিটেন ছিল সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী।
অনেক গবেষকের ধারণা, এটি সম্ভবত ইস্ট এংলিয়া অঞ্চলের রাজা রায়েডওয়াল্ড-এর সমাধি। যদিও সেখানে কোনো দেহাবশেষ পাওয়া যায়নি, পরে মাটির রাসায়নিক বিশ্লেষণে মানুষের উপস্থিতির চিহ্ন মিলেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মাটির অতিরিক্ত অম্লতার কারণে দেহ গলে গেছে।
এই আবিষ্কার ব্রিটিশ ইতিহাসে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সাটন হুর ধনসম্পদ লন্ডনের আন্ডারগ্রাউন্ড টানেলে লুকিয়ে রাখা হয়, যাতে বোমা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। পরে সেগুলো ব্রিটিশ জাদুঘরে স্থানান্তর করা হয়, যেখানে এখনো এগুলো প্রদর্শিত হচ্ছে।
সাটন হুকে ঘিরে আগ্রহ নতুন করে বাড়ে ২০২১ সালে মুক্তি পাওয়া নেটফ্লিক্স-এর চলচ্চিত্র দ্য ডিগ-এর মাধ্যমে। সিনেমাটিতে বাসিল ব্রাউন ও এডিথ প্রিটির গল্প তুলে ধরা হয়। এরপর নতুন প্রজন্মের মধ্যেও সাটন হুর ইতিহাস নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়।
এখনো সাটন হুতে গবেষণা চলছে। প্রত্নতত্ত্ববিদরা বলছেন, পুরো এলাকা এখনো সম্পূর্ণ খনন করা হয়নি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেখানে ব্রোমশেল বাকেট নামে পরিচিত একটি রহস্যময় পাত্র নিয়েও নতুন তথ্য পাওয়া গেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, সেটি বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য থেকে আনা হয়েছিল এবং এতে গুরুত্বপূর্ণ এক ব্যক্তির দাহ করা দেহাবশেষ রাখা ছিল। এই আবিষ্কার আবারও প্রমাণ করেছে যে অ্যাংলো-স্যাক্সন ব্রিটেনের সঙ্গে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তৃত যোগাযোগ ছিল।
ইতিহাসবিদদের মতে, সাটন হু শুধু একটি সমাধি নয়; এটি এমন এক সময়ের জানালা, যাকে একসময় ইউরোপের ডার্ক এজ বলা হতো। কিন্তু সেই মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা জাহাজই দেখিয়ে দেয়, ইতিহাসের সেই অধ্যায় আসলে অন্ধকার ছিল না, বরং ছিল শক্তি, শিল্প ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগে ভরপুর এক জটিল সভ্যতার গল্প।
সূত্র: দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, দ্য ইকোনোমিক টাইমস, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকস, দ্য নিউইয়র্কার