সৌদি আরবের লোহিত সাগরের উপকূলে গড়ে উঠছে এক বিস্ময়কর স্থাপত্য, যা মানুষের কল্পনাকেও হার মানায়। নিউম প্রকল্পের অধীনে নির্মীয়মাণ এই শহরটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘দ্য লাইন’, বিশ্বের প্রথম ‘ভবিষ্যৎ শহর’। সম্প্রতি বিবিসি বাংলার একটি প্রতিবেদনে এই মেগা সিটির নির্মাণশৈলী এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে নতুন কিছু তথ্য উঠে এসেছে।
ঐতিহ্যগতভাবে আমরা যে ধরনের বৃত্তাকার বা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা শহর দেখে অভ্যস্ত, দ্য লাইন তার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হবে। এটি হবে ১৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সরলরেখাকৃতির শহর, যা মরুভূমিকে চিরে চলে গেছে দিগন্তের ওপাড়ে।
এই শহরের সবচাইতে চমকপ্রদ দিক হলো এর উচ্চতা এবং আবাসন ব্যবস্থা। বিশাল দুই সমান্তরাল আয়না দিয়ে ঘেরা এই কাঠামোর উচ্চতা হবে ৫০০ মিটার, যা অনেক দেশের আকাশচুম্বী ভবনকেও ছাড়িয়ে যাবে। শহরটি এমনভাবে নকশা করা হয়েছে যেখানে কোনো গাড়ি থাকবে না, থাকবে না কোনো রাজপথ। ফলে কার্বন নিঃসরণ হবে শূন্য।
কিন্তু প্রশ্ন উঠতে পারে, ১৭০ কিলোমিটার যাতায়াত হবে কীভাবে? সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, শহরের নিচ দিয়ে চলবে উচ্চগতির ট্রেন, যা মাত্র ২০ মিনিটে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছে দেবে বাসিন্দাদের। এছাড়া ৫ মিনিটের হাঁটা দূরত্বের মধ্যেই পাওয়া যাবে দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সব সুযোগ-সুবিধা।
তবে এমন উচ্চাভিলাষী প্রজেক্টকে ঘিরে বিতর্কেরও কমতি নেই। পরিবেশবাদীরা বলছেন, মাইলের পর মাইল বিস্তৃত এই কাঁচের দেয়াল মরুভূমির বাস্তুসংস্থান এবং পরিযায়ী পাখিদের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়া লোহিত সাগরের পানির লবণাক্ততা দূর করে সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা এবং মরুভূমির প্রচণ্ড উত্তাপের মধ্যে শহরের ভেতরে কৃত্রিমভাবে আরামদায়ক আবহাওয়া বজায় রাখা এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।
বিশাল এই খরচ এবং নির্মাণকাজের গতি নিয়ে অনেক বিশেষজ্ঞই সংশয় প্রকাশ করেছেন। অনেকে একে দেখছেন ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের ভিশন ২০৩০-এর এক দুঃসাহসী বাজি হিসেবে।
এতসব চ্যালেঞ্জ আর বিতর্কের মাঝেও দ্য লাইন-এর নির্মাণকাজ পুরোদমে এগিয়ে চলছে। উচ্চাভিলাষী এই প্রকল্পটি বিপুল খরচ, আনুমানিক ৮.৮ ট্রিলিয়ন ডলার এবং নির্মাণকাজে বিলম্বের কারণে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। খবর অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে মূল পরিকল্পনা ১৭০ কিলোমিটারের বদলে মাত্র ৫ কিলোমিটার বা তার কিছু বেশি অংশ তৈরির লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে। এর ফলে জনসংখ্যাও প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা ৯ মিলিয়ন থেকে কমিয়ে ৩ লাখে নামিয়ে আনার কথা রয়েছে।
এটি কেবল একটি আবাসন প্রকল্প নয়, বরং সৌদি আরবের তেলের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতিকে পর্যটন ও প্রযুক্তিনির্ভর করে তোলার এক মহাপরিকল্পনা। যদি সফল হয়, তবে এটি হবে পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম কোনো ত্রিমাত্রিক শহর, যেখানে মানুষ মাটির সমান্তরালে নয় বরং স্তরে স্তরে বসবাস করবে। মরুভূমির বুকে এই কৃত্রিম স্বর্গরাজ্য শেষ পর্যন্ত বাস্তবের রূপ পায় কি না, সেদিকেই এখন তাকিয়ে আছে সারা বিশ্ব।